কৃষি খবর ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) মাসিক বিশ্ব কৃষিপণ্য সরবরাহ ও চাহিদা পূর্বাভাস (ওয়াসডে) প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ৯ অক্টোবর বিশ্ব শস্যবাজারে বড় ধরনের চমক দেখা দেয়। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশার তুলনায় ভুট্টার ফলন পূর্বাভাস অনেক বেশি বাড়িয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সয়াবিনের রেকর্ড উৎপাদনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে দেশটিতে গমের উৎপাদন নেমে এসেছে ১৯৭০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

ইউএসডিএর নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি একরে ভুট্টার ফলন দাঁড়াতে পারে ১৮১ দশমিক ১ বুশেল। সেপ্টেম্বরে দেওয়া পূর্বাভাসের তুলনায় এটি ২ দশমিক ৭ বুশেল বেশি। আর প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ডাও জোন্সের সংকলিত ব্যবসায়ীদের গড় পূর্বাভাসের চেয়ে ৩ দশমিক ৬ বুশেল বেশি।

ফলন বাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভুট্টার সম্ভাব্য মোট উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০৩ কোটি ৪০ লাখ বুশেলে। সেপ্টেম্বরে দেওয়া পূর্বাভাসের চেয়ে এটি ২৩ কোটি ৪০ লাখ বুশেল বেশি। আর ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ৩১ কোটি ৮০ লাখ বুশেল।

উৎপাদন বাড়ার প্রভাবে মৌসুম শেষে ভুট্টার সম্ভাব্য মজুতের পূর্বাভাস ২৮ কোটি ২০ লাখ বুশেল বাড়িয়ে ১৮৪ কোটি ৯০ লাখ বুশেল করেছে ইউএসডিএ। একই সঙ্গে মৌসুমে কৃষক পর্যায়ে ভুট্টার গড় মূল্য পূর্বাভাস বুশেলপ্রতি ১০ সেন্ট কমিয়ে ৪ ডলার ৭০ সেন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।

সয়াবিনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ইউএসডিএ প্রতি একরে সয়াবিনের ফলন পূর্বাভাস বাড়িয়ে রেকর্ড ৫৩ দশমিক ১ বুশেল করেছে। সেপ্টেম্বরে দেওয়া পূর্বাভাস এবং প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ব্যবসায়ীদের গড় অনুমান উভয়ের চেয়ে এ হিসাব কিছুটা বেশি। ব্যবসায়ীদের গড় পূর্বাভাস ছিল ৫২ দশমিক ৯ বুশেল।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সয়াবিনের সম্ভাব্য উৎপাদন বেড়ে রেকর্ড ৪৫৬ কোটি ২০ লাখ বুশেলে পৌঁছেছে। পাশাপাশি রপ্তানির পূর্বাভাস ১ কোটি বুশেল বাড়িয়ে ১৬৯ কোটি ৫০ লাখ বুশেল করা হয়েছে। মৌসুম শেষে সয়াবিনের সম্ভাব্য মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ কোটি ৫০ লাখ বুশেলে।

সরবরাহ বাড়লেও রপ্তানির ইতিবাচক পূর্বাভাসের কারণে সয়াবিনের মৌসুমভিত্তিক গড় মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ইউএসডিএর হিসাবে, প্রতি বুশেল সয়াবিনের গড় মূল্য ১২ ডলার থাকবে।

ভুট্টা ও সয়াবিনের বিপরীতে গমের মোট উৎপাদন কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এবার গমের উৎপাদন দাঁড়াতে পারে ১৫৩ কোটি ৪০ লাখ বুশেলে, যা ১৯৭০ সালের পর সর্বনিম্ন। তবে প্রতি একরে গমের ফলন পূর্বাভাস ৪৭ দশমিক ৮ বুশেল থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দশমিক ১ বুশেল করা হয়েছে।

গমের উৎপাদন কমলেও মৌসুম শেষে সম্ভাব্য মজুত ২ কোটি ৩০ লাখ বুশেল বেড়ে ৭৪ কোটি বুশেলে দাঁড়িয়েছে। এদিকে গমের মৌসুমভিত্তিক গড় মূল্য পূর্বাভাস বুশেলপ্রতি ১০ সেন্ট কমিয়ে ৬ ডলার ৩০ সেন্ট করেছে ইউএসডিএ।

শস্যবাজারে ব্যাপক ওঠানামা

ভুট্টার ফলন পূর্বাভাসে বড় ধরনের বৃদ্ধির ঘোষণায় শস্যবাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ডিসেম্বর মেয়াদি ভুট্টার ফিউচারস চুক্তির দাম একপর্যায়ে দৈনিক নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা অনুযায়ী কমে যায়। পরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও দিন শেষে দাম ২০ দশমিক ৫ সেন্ট কমে বুশেলপ্রতি ৪ ডলার ৭৯ দশমিক ৭৫ সেন্টে দাঁড়ায়।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বাজারে ফটকাবাজি নির্ভর বড় অঙ্কের ক্রয় অবস্থান তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে সেপ্টেম্বরে ভুট্টার মজুত বৃদ্ধির তথ্য যুক্ত হয়ে প্রাথমিক বিক্রির চাপ আরও বাড়ায়।

অন্যদিকে, নভেম্বর মেয়াদি সয়াবিন ফিউচারস চুক্তির দাম দিনের সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে ২২ সেন্টেরও বেশি বেড়ে যায়। দিন শেষে দাম ৪ দশমিক ৫ সেন্ট বেড়ে বুশেলপ্রতি ১২ ডলার ৯৪ সেন্টে দাঁড়ায়। উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও রপ্তানির পূর্বাভাস বৃদ্ধির কারণে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ডিসেম্বর মেয়াদি কানসাস সিটি গম ফিউচারস চুক্তির দাম দিন শেষে ১৭ সেন্ট কমে বুশেলপ্রতি ৭ ডলার ১৯ দশমিক ২৫ সেন্টে নেমে আসে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বৈশ্বিক সরবরাহেও পরিবর্তন

অক্টোবরের ওয়াসডে প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিভিন্ন দেশের উৎপাদন, মজুত ও রপ্তানির পূর্বাভাসেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ভুট্টার মৌসুমশেষ মজুতের পূর্বাভাস ৮৩ লাখ টন বাড়িয়ে ২৮ কোটি ৪ লাখ টন করেছে ইউএসডিএ। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশই ৭০ লাখ টনের কিছু বেশি। সংস্থাটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভুট্টার উৎপাদন পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ কোটি ৮০ লাখ টন করেছে। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনায় ভুট্টার মজুতের পূর্বাভাস বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্বে সয়াবিনের মৌসুমশেষ মজুতের পূর্বাভাস সামান্য বেড়ে ১২ কোটি ৪৩ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের হিসাবের চেয়ে ৩ লাখ টন বেশি।

তবে পাম তেলের ক্ষেত্রে উৎপাদন পূর্বাভাস ২৫ লাখ টন কমানো হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক পাম তেল উৎপাদনের পূর্বাভাস ২০১৭-১৮ মৌসুমের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

গমের বৈশ্বিক উৎপাদন পূর্বাভাসেও বিভিন্ন দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে উৎপাদনের হিসাব ৮ লাখ টন কমিয়েছে ইউএসডিএ। অন্যদিকে, কানাডা ও তুরস্কে উৎপাদনের পূর্বাভাস প্রতিটি দেশের জন্য ৫ লাখ টন করে বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে, রাশিয়ার গম রপ্তানির পূর্বাভাস ৩০ লাখ টন কমিয়ে ৪ কোটি টন করা হয়েছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে এসব পরিবর্তনের পরও বিশ্বে গমের মৌসুমশেষ মজুতের পূর্বাভাস প্রায় অপরিবর্তিত রেখে ২৭ কোটি ৬০ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ভুট্টা ও সয়াবিনের বাড়তি উৎপাদন এবং বিভিন্ন দেশে শস্যের উৎপাদন, মজুত ও রপ্তানির পরিবর্তন আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, গমের উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের পূর্বাভাসে ভিন্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।