কৃষি খবর ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জলবায়ু সহনশীল জোয়ারের উন্নত জাত উদ্ভাবনে যৌথভাবে কাজ করছে গুগল ডিপমাইন্ড ও আন্তর্জাতিক শুষ্ক অঞ্চলের ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিআরআইস্যাট। এ উদ্যোগে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

গুগল ডটঅর্গের ‘এআই কোলাবরেটিভ ফর ফুড সিকিউরিটি’ কর্মসূচির সহায়তায় পরিচালিত এ উদ্যোগে রয়েছে হাডসনআলফা ইনস্টিটিউট ফর বায়োটেকনোলজি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের জিনোম সায়েন্সেস বিভাগ।

এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য জোয়ারের একটি উন্মুক্ত জেনেটিক অ্যাটলাস বা জিনগত তথ্যভান্ডার তৈরি করা। জোয়ার শুষ্ক অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষ হওয়া জলবায়ু সহনশীল ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি ফসল। এই তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে গবেষক ও উদ্ভিদ প্রজননবিদেরা উপযোগী জিনগত বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় শনাক্ত করতে পারবেন। এর ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম উন্নত জাত উদ্ভাবন সহজ হবে।

প্রকল্পটিতে আইসিআরআইস্যাটের জিনব্যাংকে সংরক্ষিত জোয়ারের বীজের প্রতিনিধিত্বশীল নমুনা ব্যবহার করা হবে। ওই জিনব্যাংকে ভারতসহ ৯০টির বেশি দেশের ৪৪ হাজারেরও বেশি স্বতন্ত্র বীজ সংগ্রহ রয়েছে। উন্নত জিনগত বিশ্লেষণ ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির তুলনায় দ্রুত ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়েছে অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রচলিত পদ্ধতিতে এ কাজে এক দশক বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

এই জিনগত তথ্যভান্ডার মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, পশুখাদ্য উৎপাদন এবং জৈব জ্বালানি তৈরিতে উপযোগী জোয়ারের জাত নিয়ে গবেষণায় সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তথ্যভান্ডারটি উন্মুক্ত রাখার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক ও উদ্ভিদ প্রজননবিদেরা এটি ব্যবহার করতে পারবেন।

আইসিআরআইস্যাটে গবেষণা ফেলোশিপ দেবে গুগল ডিপমাইন্ড

সহযোগিতার অংশ হিসেবে আইসিআরআইস্যাটে তিন বছর মেয়াদি পোস্টডক্টরাল গবেষণা ফেলোশিপে সহায়তা দেবে গুগল ডিপমাইন্ড। ভারতে প্রতিষ্ঠানটির এ ধরনের প্রথম কর্মসূচি এটি। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাইরে এটিই গুগল ডিপমাইন্ডের প্রথম ফেলোশিপ কর্মসূচি।

জোয়ারের পাশাপাশি ছোলা, চিনাবাদাম ও অড়হরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের জিনোম বিশ্লেষণের উপযোগী সরঞ্জাম তৈরির বিষয়টিও গবেষণায় অনুসন্ধান করা হবে। এর মাধ্যমে জিনগত গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে।

জলবায়ুর পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও ফসলের উৎপাদনশীলতা ও পুষ্টিমান বজায় রাখার উপযোগী জাত উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। বিশেষ করে শুষ্ক অঞ্চলের কৃষিতে জোয়ারসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র দানাশস্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব অঞ্চলে পানির সংকট ও ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠা আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

আইসিআরআইস্যাটের গবেষণা ও উদ্ভাবন বিভাগের উপমহাপরিচালক ড. স্ট্যানফোর্ড ব্লেড বলেন, শুষ্ক অঞ্চলের কৃষির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করবে এ অংশীদারত্ব।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় শুষ্ক অঞ্চলে ফসলের উৎপাদনশীলতা, সহনশীলতা ও টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আইসিআরআইস্যাট। গুগলের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে কৃষি রূপান্তরে এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বাইরে গুগল ডিপমাইন্ডের প্রথম ফেলোশিপ কর্মসূচির অংশ হতে পেরে তাঁরা সম্মানিত। তাঁদের লক্ষ্য, জোয়ারের মতো স্থানীয়ভাবে প্রচলিত জলবায়ু সহনশীল ফসলের বৈশ্বিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষি খাতকে শক্তিশালী করা, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকে।

ভারতে এআইভিত্তিক কৃষি তথ্যসেবা সম্প্রসারণ করছে গুগল

ফসল গবেষণার পাশাপাশি কৃষি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা দিতে নিজেদের ‘অ্যাগ্রিকালচারাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ মডেলের ব্যবহারও বাড়াচ্ছে গুগল। প্রতিষ্ঠানটির অ্যানথ্রোকৃষি দল এসব মডেল তৈরি করেছে। শুরুতে ভারতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে ১১টি দেশের জন্য কৃষিবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ সরবরাহ করছে মডেলগুলো।

ভারতের গুজরাটে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যামনেক্স রাজ্য সরকারের ‘কৃষি প্রগতি’ ফসলবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্মে গুগলের কৃষি মডেলের এপিআই যুক্ত করেছে। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্ল্যাটফর্মটি রাজ্যের ছয় লাখের বেশি কৃষকের কাছে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে ৯০ কোটিরও বেশি কৃষি পরামর্শ পৌঁছে দিতে সহায়তা করেছে।

এসব পরামর্শে ফসল ও মাটির স্বাস্থ্য, পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং আবহাওয়ার ধরনসংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে ১ কোটি ৪০ লাখ হেক্টরের বেশি জমির কৃষি কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

অ্যামনেক্স ইনফোটেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিরব শাহ বলেন, খামার পর্যায়ে সময়োপযোগী তথ্যের অভাব দীর্ঘদিন ধরে কৃষি বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা তৈরি করেছে। ফলে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা পদক্ষেপ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।

তিনি বলেন, গুগলের এএলইউ ও অ্যামেড মডেল এ সমস্যা সমাধানে সহায়তা করেছে। এগুলোর মাধ্যমে যাচাইকৃত ও তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ জমিভিত্তিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা ভারতের কৃষককেন্দ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামোকে শক্তিশালী করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সহায়তায় গুজরাটের কৃষি প্রগতির মতো প্ল্যাটফর্ম কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি, ফসলের ফলনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি আনতে ভূমিকা রাখছে।

এ ছাড়া গুগল বৈশ্বিক জোট ‘ওপেনঅ্যাগ্রিনেট’-এর সঙ্গেও কাজ করছে। এক্সেপস্টেপ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ জোট কৃষি প্রশাসকদের জন্য তৈরি একটি বিশ্লেষণ ড্যাশবোর্ডে গুগলের কৃষিবিষয়ক এপিআই যুক্ত করেছে। কৃষি খাতের বৃহত্তর পরিসরে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও কাজ চলছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো বিভিন্ন উৎসে ছড়িয়ে থাকা কৃষিবিষয়ক তথ্য এক জায়গায় এনে কৃষকদের কাছে তাঁদের পছন্দের ভাষায় সহজলভ্য করা। পাশাপাশি বিশেষায়িত কৃষিসেবা তৈরিতে কাজ করা উদ্ভাবক এবং কৃষক পর্যায়ের আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন এমন সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোও এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে।

গুগল জানিয়েছে, তাদের ‘অ্যাগ্রিকালচারাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ মডেলগুলো পাবলিক প্রিভিউ হিসেবে উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে সফটওয়্যার ডেভেলপার, স্টার্টআপ ও গবেষকেরা স্থানীয় কৃষি পরিস্থিতি এবং নির্দিষ্ট কৃষি সমস্যার উপযোগী বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সেবা তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করতে পারবেন।

সব মিলিয়ে, এআইভিত্তিক ফসলের জিনগত গবেষণা ও ডিজিটাল কৃষি তথ্যসেবার সমন্বয় কৃষির উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।