কৃষি খবর ডেস্ক: ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন বন উজাড়বিরোধী আইন কার্যকর হওয়ার আগে ইউরোপের সয়াখৈল বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আর্জেন্টিনা। আগামী ৩০ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই আইনের কারণে ব্রাজিল থেকে সয়াখৈল আমদানিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইউরোপের ক্রেতারা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপের বাজারে সরবরাহ বাড়াতে চায় বিশ্বের শীর্ষ সয়াখৈল রপ্তানিকারক দেশ আর্জেন্টিনা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন উজাড়বিরোধী প্রবিধান (ইইউডিআর) অনুযায়ী, সয়াবিনসহ নির্দিষ্ট কিছু কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হবে যে সেগুলো ২০২০ সালের পর বন বা প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে তৈরি করা জমি থেকে উৎপাদিত হয়নি। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারে।

ব্রাজিলের রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট সয়াখৈল আমদানির প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করে ব্রাজিল। ২০২৫ সালে দেশটি রেকর্ড ২ কোটি ৩৩ লাখ টন সয়াখৈল রপ্তানি করেছে।

তবে ইউরোপীয় পশুখাদ্য প্রস্তুতকারকদের সংগঠন ফেফাকের আশঙ্কা, নতুন আইন কার্যকর হলে ব্রাজিলের প্রায় ৪০ লাখ টন সয়াখৈল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ এই পরিমাণের সমান।

সংগঠনটির মতে, ব্রাজিলের মধ্যাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক সয়াবিন উৎপাদন এলাকা আগে পরিষ্কার করা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর অবস্থিত। এসব এলাকা আবার রপ্তানি বন্দরের কাছ থেকেও অনেক দূরে। ফলে উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত সরবরাহের তথ্য যাচাই ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

ইউরোপের বিকল্প সরবরাহকারী হতে চায় আর্জেন্টিনা

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সয়াখৈল রপ্তানিকারক আর্জেন্টিনা গত বছর প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টন সয়াখৈল রপ্তানি করেছে। এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ গেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে। এবার ইউরোপের বাজারেও সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ দেখছে দেশটি।

আর্জেন্টিনার সয়াবিন উৎপাদন এলাকাগুলোর বড় অংশ রোজারিও নদীবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক অঞ্চলের প্রায় ৩৫০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। বিপরীতে ব্রাজিলের প্রধান উৎপাদনকারী রাজ্য মাতো গ্রোসোর অনেক খামার রপ্তানি বন্দর থেকে ২ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে।

ফেফাকের মূল্যায়নে বন উজাড়ের ঝুঁকির দিক থেকে আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে ‘নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ। অন্যদিকে ব্রাজিলকে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সংগঠনটির পূর্বাভাস, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার উৎপাদিত প্রায় সব সয়াখৈলই ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন মানদণ্ড পূরণ করতে পারবে।

রোজারিওভিত্তিক শস্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ম্যাক্স অ্যাগ্রোর গবেষণা ব্যবস্থাপক দান্তে রোমানো বলেন, ব্রাজিলের চালান কমে গেলে আর্জেন্টিনা লাভবান হতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপে সরবরাহ করতে না পারা ব্রাজিলের সয়াবিন অন্য বাজারে চলে যেতে পারে।

আর্জেন্টিনার শস্য রপ্তানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের সংগঠন সিআইএআরএ-সিইসির সভাপতি গুস্তাভো ইদিগোরাস জানিয়েছেন, তাঁদের দেশের পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ‘ভিসেক’ পুরোপুরি কার্যকর এবং নতুন নিয়ম মেনে চলতে প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, ‘আর্জেন্টিনা প্রস্তুত।’

নতুন আইন নিয়ে আপত্তি ব্রাজিলের কৃষকদের

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিয়মকে নিজেদের প্রতি বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন ব্রাজিলের কৃষকেরা। দেশটির সয়াবিন উৎপাদক সমিতি অ্যাপ্রোসোজার সভাপতি মরিসিও বুফন বলেছেন, ব্রাজিলের বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। তাঁর দাবি, ব্রাজিলের কৃষির আকারের তুলনায় দেশটির পরিবেশগত সমস্যার ব্যাপ্তি অনেক কম।

আর্জেন্টিনার কৃষিশিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন আইন কার্যকর হলে ইউরোপমুখী ব্রাজিলের ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব পণ্যের জন্য তখন বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে, অথবা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হবে।

প্যারাগুয়েও সুযোগ কাজে লাগাতে চায়

নতুন নিয়মের সময়কাল নিয়ে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনাও তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নতুন মেয়াদ শুরুর কয়েক দিন আগেই ইইউডিআর কার্যকর হওয়ার কথা। এর আগে মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্য জোট মারকোসুরের মধ্যে একটি অস্থায়ী মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল দুই অঞ্চলের বাণিজ্যিক বাধা কমানো। কিন্তু নতুন পরিবেশগত বিধিনিষেধ বাণিজ্যে বাড়তি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

দক্ষিণ আমেরিকার আরেক বড় সয়াবিন রপ্তানিকারক দেশ প্যারাগুয়েও এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। দেশটির শস্য প্রক্রিয়াজাতকারীদের সংগঠন ক্যাপ্রো জানিয়েছে, তাদের প্রধান কৃষি উৎপাদন অঞ্চল ওরিয়েন্টাল অঞ্চলে ২০০৪ সাল থেকেই নতুন করে কৃষিজমি তৈরির জন্য বন উজাড় নিষিদ্ধ। ফলে নতুন নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে দেশটি আগে থেকেই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

সরবরাহের পাশাপাশি নথিপত্র নিয়েও বাড়ছে প্রতিযোগিতা

নতুন আইন কার্যকরের আগে কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপের তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে কোন জমিতে সয়াবিন উৎপাদিত হয়েছে, সেই জমির সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান এবং উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পণ্যের মালিকানা ও সরবরাহের ধারাবাহিক নথি সংরক্ষণ করতে হবে।

ইউরোপের ক্রেতারা এখন শুধু সরবরাহকারীর মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে চাইছেন না। তাঁরা জমির অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ও পণ্যের উৎস যাচাইয়ের নথি চাইবেন। ফলে কোনো সয়াবিন সম্প্রতি বন উজাড় করা জমিতে উৎপাদিত না হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চুক্তি হারাতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপের সয়াখৈল বাজারে প্রতিযোগিতা এখন শুধু উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ এবং নির্ভরযোগ্য নথিপত্র নিশ্চিত করাও রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

সূত্র: গ্লোবাল এগ্রিকালচার