ফারুক আহমাদ আরিফ, রাজশাহী থেকে ফিরে: আমের রাজ্য রাজশাহী অঞ্চলের চাষিরা ভালো নেই। বুড়ো গাছে আগের মত আম ধরছে না। এদিকে পরিচর্যা আর দেখভালের খরচ দিনকে দিন বাড়ছে। নিরুপায় হয়ে অনেক গাছ কাটছেন, কেউ বিমুখ হয়ে বাগান ছাড়ছেন। এমন পরিস্থিতি চাষীদের রক্ষা কবজ হিসেবে সামনে আসল ‌‘টপ ওয়ার্কিং’ পদ্ধতি। না কেটে পুরনো গাছে নতুন আম গাছ। তাও আবার বছরে ৩ বার ফলন দেয় ‌'কাঠিমন আম' গাছ।  ইতিমধ্যে এই বেশ পরিচিত পেয়েছে। মৌসুম ছাড়া মিলে, তাই দামও ভালো। 

‘টপ ওয়ার্কিং’

পুরনো গাছের ডাল কেটে সেখানে নতুন জাতের কলম বসিয়ে কাটিমনে রুপান্তর করছেন। কৃষিতে পদ্ধতির নাম হচ্ছে ‘টপ ওয়ার্কিং’। গাছের গোড়া ও শিকড় না কেটে অক্ষত রেখে ওপরের অংশে নতুন জাতের ডাল তৈরি করা হয়। এতে করে নতুন চারা লাগিয়ে বাগান তৈরির জন্য বহু বছর অপেক্ষা করতে হয় না। পুরনো গাছের দেহেই বেড়ে উঠে নতুন কলম। এ যেন প্রবীণের বুকে জন্ম নেওয়া নবীণের হাসি। 

সম্প্রতি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া গ্রামের নাহিদা আক্তারের বাগানে গিয়ে দেখা যায় গাছগুলোতে কাটিমন আম দুলছে। কোন কোন আম পলিপ্যাগ করা। কোনটা প্যাগ ছাড়া। তার ৫০ শতকের বাগানে রয়েছে এক হাজার ৬০০ আমগাছ। 

তিনি জানান, এটি মূলত লক্ষণভোগ জাতের আমের বাগান। গাছগুলোর বয়স ১২-১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কমেছে ফলন। এই বিপাকের মধ্যে পাশে দাঁড়ায় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পুরাতন গাছ ঠিক রেখে ডালপালা কেটে সেখানে কাটিমন আমের জাতের রুপান্তর করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ নিয়ে লক্ষণভোগের পুরাতন গাছের বাগানটিকে পরিণত করেন কাটিমনে।
 
নাহিদা আক্তার বলেন, ‘মৌসুমে প্রতি কেজি আম বিক্রি হয় ২০-৩০ টাকা কেজি অথচ কাটিমন আম বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি। সেটি আবার বাগান থেকেই কিনে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। তিনি জানান, প্রকল্পটি থেকে তাদেরকে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সার, পানি স্প্রে করার প্রযুক্তি দেওয়া হয়েছে।
 
অপর এক চাষি বলেন, আমরা বছর অন্তত ২ বার ভালো পরিমাণ আম পাচ্ছি। তৃতীয়বারের ফলন কিছুটা কম। তিনি বলেন, তবে এ মৌসুমে আমগুলোকে প্যাকেটিং করতে হয়। এতে করে খরচ কিছুটা বেশি হয়। আর খরচ হলেও কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা যায়। 

আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পরে পরিচালক কৃষিবিদ এস.এম হাসানুজ্জামান বলেন, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোরে প্রচুর আমের ফলন হয়। এসব অঞ্চলে অনেক পুরাতন বাগানও রয়েছে। এসব পুরানা গাছে ফলন কম। তাতে করে কৃষকদের মুনাফা কম হচ্ছে। সেদিকটি চিন্তা করে আমরা প্রবীণ গাছগুলোর ডাল ছেটে কাটিমন জাতের গ্রাফটিং করে দিচ্ছি। তাতে করে বছরে ৩ বার অর্থাৎ ১২ মাসই আম পাওয়া যাচ্ছে। কৃষকরা বেশি দামে আম বিক্রি করতে পারছেন। তিনি বলেন, টপ ওয়ার্কিংয়ের সুফলটা এখন পর্যন্ত ভালো আছে। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ বছরের যেসব বাগান রয়েছে এগুলোর জাত পরিবর্তন করে কাটিমনে রুপান্তর করা। 

কৃষিবিদ এস.এম হাসানুজ্জামান বলেন, বর্তমানে ১০০ বিঘা জমিতে টপ ওয়ার্কিং করা হয়েছে। এসবের আম বাজারে ভালো দাম পাচ্ছে ও কৃষক লাভবান হচ্ছে। রাজশাহী ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁসহ অন্যান্য জেলায় ব্যাপক পরিমাণে টপ ওয়ার্কিং পদ্ধতি প্রয়োগ হচ্ছে।

এখন রাজধানীর ফলের দোকানগুলোতে শোভা যাচ্ছে হলুদ সোনালী আভার আম। রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোরসহ পার্বত্য অঞ্চলে আমটির আবাদ দিনকে দিন বাড়ছে। 

এদিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কথা হয় ফল বিক্রেতা আবু তাহেরের সঙ্গে। তিনি বলেন, বর্তমানে কাটিমন আম বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা কেজিতে। তা ছাড়া রাজধানীর ফুটপাত ও পাড়া-মহল্লার ফলের দোকানগুলোতে কোয়ালিটিভেদে কাটিমন আম বিক্রি হচ্ছে ২০০-২৫০ টাকায়।