ফারুক আহমাদ আরিফ: জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের হ্রাস এবং ভূমির অবক্ষয় প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অথচ এগুলোর ওপর মূলত নির্ভরশীল খাদ্য উৎপাদন। এসব অবক্ষয়ের কারণে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে ১৯-৩০ অক্টোবর এফএওর কপ১৭ উপলক্ষে প্রকাশিত একটি ফ্লাগশিপে এসব কথা বলা হয়। ফ্লাগশিপে ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন হওয়া বেশকিছু কার্যক্রমের সফলতাও তুলে ধরা হয়েছে। 

জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও সহনশীলতার জন্য কৃষি-খাদ্য সমাধান শীর্ষক ফ্লাগশিপে বলা হয়, বিজ্ঞানভিত্তিক ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত সমাধান যা খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করে এবং জলবায়ুবিষয়ক সহনশীলতাকে শক্তিশালী করে।

খরা, প্রচণ্ড তাপ ও দাবানলসহ তিনটি দুর্যোগের ক্ষতির দিক তুলে ধরে তাতে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী খরা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে। প্রচণ্ড তাপ ফসল নষ্ট, গবাদি পশুর ক্ষতি এবং খাদ্য উৎপাদনকারী মানুষদের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তোলে। দাবানল এমন বনভূমি ধ্বংস করে যা জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, মাটিকে সুরক্ষা দেয় এবং খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে।

সংস্থাটি উষ্ণ ও অস্থির পৃথিবীতে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে উল্লেখ করে বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সমাধান কার্যকর করা হচ্ছে। প্রতিটি বিকল্প প্রাকৃতিক পরিবেশকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং সহনশীলতা গড়ে তুলতে পারে।

কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ভূমি ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার’

পুনরুদ্ধার কেবল প্রকৃতিকে মেরামতই করে না বরং এটি সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে যার ওপর খাদ্য উৎপাদন নির্ভরশীল। সুস্থ মাটিতে আর্দ্রতা বেশি থাকে। অরণ্য জলচক্র নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভূমিক্ষয় রোধ করে। ম্যানগ্রোভ ও জলাভূমি ঝড় থেকে সুরক্ষা দেয় এবং মৎস্যসম্পদকে সহায়তা করে। সুপরিচালিত চারণভূমি উন্নত পশুখাদ্য জোগায় এবং নাজুক ভূমির ওপর চাপ কমায়।

বর্তমানে আফ্রিকান দেশ মালাউইতে বনভূমির পুনর্জন্ম, মাটি ও জল সংরক্ষণ এবং নতুন গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি ও বনভূমিকে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছ। সেখানে বনভূমি বিকশিত হচ্ছে; পাশাপাশি মৌমাছি পালন ও কৃষি-বনব্যবস্থা (অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি) এমন জীবিকার সুযোগ তৈরি করছে, যা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমিয়ে আনছে।

শস্য, বীজ এবং জাতের আনতে হবে বৈচিত্র্য 

একটি কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা যত বেশি বৈচিত্র্যময় হয় জলবায়ু পরিবর্তনের সময় তার কাছে তত বেশি বিকল্প থাকে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ফ্লাগশিপে। তাতে বলা হয়, জীববৈচিত্র্য শুধু সংরক্ষণের লক্ষ্য নয়, এটি প্রতিকূলতা মোকাবিলার একটি হাতিয়ার। যখন তাপ, খরা, বন্যা, কীটপতঙ্গ বা রোগ উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন জিনগত বৈচিত্র্য কৃষকদের আরও বেশি বিকল্প দেয়; শস্যের জাত ও গবাদি পশুর প্রজাতি থেকে শুরু করে পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে আরও ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম জলজ প্রজাতি পর্যন্ত এর বিস্তৃতি রয়েছে।

আফ্রিকার জিম্বাবুয়েতে জিইএফ-এর ‘ড্রাইল্যান্ড সাসটেইনেবল ল্যান্ডস্কেপস ইমপ্যাক্ট প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে গড়ে ওঠা কমিউনিটি বীজ ব্যাংকগুলো কৃষকদের ভুট্টার বাইরে স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত ঐতিহ্যবাহী শস্য, ডাল এবং শুষ্ক অবস্থার জন্য আরও উপযুক্ত শাকসবজির মাধ্যমে বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করছে। ২০২৫ সালে অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর আয় ইতিমধ্যে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শস্যের অধিক বৈচিত্র্য খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য নিরাপত্তা উন্নত করেছে।

প্রচণ্ড তাপের বিরুদ্ধে সহনশীলতা গড়ে তুলতে হবে

প্রচণ্ড তাপ খাদ্য উৎপাদনের পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দিচ্ছে—এর ফলে ফসলের ফলন কমছে, গবাদি পশুর ওপর চাপ বাড়ছে, মৎস্যসম্পদ ও বনভূমির ক্ষতি হচ্ছে। যারা আমাদের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন সেইসব কৃষকরা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এজন্য ছায়া ও বৃক্ষ আচ্ছাদন, মাটি ও পানির উন্নত ব্যবস্থাপনা, তাপ-সহনশীল ফসল ও জাতের ব্যবহার, গবাদি পশুর জন্য উন্নত আবাসস্থল, কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং আগাম সতর্কবার্তা—এসব পদক্ষেপ তাপজনিত চাপ কমিয়ে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে সাহায্য করতে পারে।

ইতিমধ্যে কম্বোডিয়ায় ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ (জিসিএফ)-এর সহায়তায় পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় দেওয়া আবহাওয়াবিষয়ক সতর্কবার্তা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে প্রচণ্ড তাপের জন্য প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করছে। ‘এল নিনো’-র প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বিঘ্ন ঘটায়। এতে কৃষকরা এখন তাপ ও ​​খরার ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগেই ধারণা পেয়ে তাদের চাষাবাদ পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারছে। তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার পূর্বাভাস থাকলে সতর্কবার্তায় শাকসবজিকে ছায়ার নিচে রাখা, পানি সংরক্ষণ করা এবং দিনের শীতল সময়ে সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

স্বল্পতার আগেই নিশ্চিত করতে হবে পানি ব্যবস্থাপনা 

জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ যেখানে খাদ্য উৎপাদনের সংকট তৈরি করতে পারে, তার অন্যতম মাধ্যম হলো পানি। এজন্য সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা দরকার। যার মধ্যে রয়েছে পানি সংরক্ষণ, মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখা, সেচ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জলাধার বা জলবিভাজিকা অঞ্চলগুলোর পুনরুদ্ধার। এর ফলে বৃষ্টিপাত কমে গেলে বা অনিয়মিত হয়ে পড়লে ফসল ও গবাদি পশুকে রক্ষা করতে সহায়তা করতে পারে। এতে করে খরা-ঝুঁকি মানচিত্রায়ন এবং আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে বীজ ও পশুখাদ্য বিতরণ, পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, চাষাবাদবিষয়ক পরামর্শ প্রদান এবং জলবায়ু-সহনশীল সেচ অবকাঠামোতে বিনিয়োগের মতো উদ্যোগগুলো সময়মতো গ্রহণ করা সম্ভব হয়। এটি কোন এলাকার ফসলি জমি ও চারণভূমি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তা শনাক্ত করতেও সহায়তা করে।

পাকিস্তানের সিন্ধু অববাহিকায় স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা যায়, কোথায় ফসল পানির অভাবজনিত চাপের মুখে রয়েছে। এই তথ্য সেচ কার্যক্রম ও পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দেয়। ফলে সীমিত পানি সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

জলবায়ু সমস্যার সমাধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে গবাদি পশুকেও

গবাদি পশুর টিকে থাকার সক্ষমতা (রেজিলিয়েন্স) পুরো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে: যেমন—খাদ্য, পানি, ছায়া, জাত, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং গোবর বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। উন্নত মানের খাদ্য, জলবায়ুর সাথে মানানসই জাত, চারণভূমির পুনরুদ্ধার, গাছ-চারণভূমি ও গবাদি পশুর সমন্বিত ব্যবস্থা (সিলভো-প্যাস্টোরাল সিস্টেম) এবং উন্নত প্রাণিস্বাস্থ্য সেবা গবাদি পশু পালন ব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করে তুলতে পারে, পাশাপাশি কমাতে পারে ক্ষতিকর নিঃসরণের মাত্রা।

ইতিমধ্যে উরুগুয়েতে, জিইএফ (জিইএফ)-এর বিনিয়োগের মাধ্যমে চারণভূমি ও পালের উন্নত ব্যবস্থাপনার ফলে ৬০টি পারিবারিক খামারের নিট আয় বর্তমানে ২৮ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া গরুর মাংসের উৎপাদন ৮ শতাংশ এবং ভেড়ার মাংসের উৎপাদন ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে তিন বছর ধরে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও, প্রতি কেজি মাংস উৎপাদনে নিঃসরণের হার ১৮ শতাংশ কমেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জলজ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে মৎস্য চাষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে বলে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, সঠিক প্রজাতি নির্বাচন, জলবায়ু বিষয়ক তথ্যের ব্যবহার এবং অধিকতর সহনশীল উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্তমানে চিলিতে উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ছোট পরিসরে মৎস্য চাষ এবং জীবিকার বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে জলবায়ু-সংবেদনশীল সামুদ্রিক সম্পদের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনেছে বলে ফ্লাগশিপে জানানো হয়েছে।