কৃষি খবর ডেস্ক: খরাপ্রবণ অঞ্চলে ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাজরার উন্নত জাত উদ্ভাবনে গবেষণা জোরদার করেছে আন্তর্জাতিক শুষ্ক অঞ্চলের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইসিআরআইএসএটি)। এ গবেষণায় শস্যের গুণগত মান, খরা সহনশীলতা ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে গত ১২ ও ১৩ অক্টোবর ভারতের নয়াদিল্লিতে আইসিআরআইএসএটির দ্বিবার্ষিক ‘পার্ল মিলেট সায়েন্টিস্টস ফিল্ড ডে’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভারত, আফ্রিকা, জাপানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৮০ জন বিজ্ঞানী অংশ নেন। তাঁরা বাজরার উন্নত প্রজনন উপাদান বা ব্রিডিং ম্যাটেরিয়াল পর্যালোচনা ও নির্বাচন করেন। ৩১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

সম্প্রতি আইসিআরআইএসএটি ও ভারতের কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (আইসিএআর) যৌথভাবে আরএইচবি ২৭৩ নামের একটি বাজরার হাইব্রিড জাত অবমুক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির দাবি, এটি বিশ্বের প্রথম তিন-লাইন পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত বাজরার হাইব্রিড। ভারতের স্বল্প বৃষ্টিপাতপ্রবণ এ১ অঞ্চলে চাষের উপযোগী করে জাতটি তৈরি করা হয়েছে। এতে শস্য উৎপাদন, খরা সহনশীলতা ও পশুখাদ্যের গুণগত মানের সমন্বয় রয়েছে। ফলে কৃষকের লাভজনকতা ও গবাদিপশুর উৎপাদন বাড়াতে জাতটি ভূমিকা রাখতে পারে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে আইসিআরআইএসএটির মহাপরিচালক ড. হিমাংশু পাঠক বলেন, কৃষকের চাহিদা ও পরিবর্তনশীল কৃষিবাজারের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করা জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এমন ফসলের জাত উন্নয়ন করতে হবে, যা কৃষকদের বাস্তব প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধা দেবে।

ফিল্ড ডেতে প্রায় ১৬ হাজার গবেষণা প্লটে বাজরার বিভিন্ন প্রজনন উপাদান প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে আট হাজার বি-লাইন, আট হাজার আর-লাইন এবং দুই হাজার পশুখাদ্য উপযোগী লাইন ছিল। বিজ্ঞানীরা এসব উপাদানের খরা ও তাপ সহনশীলতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, আগাম পরিপক্বতা, শস্যের উন্নত গুণগত মান এবং পশুখাদ্য হিসেবে পুষ্টিমান যাচাই করেন।

এ ছাড়া বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ, ব্রাউন মিডরিব (বিএমআর) বৈশিষ্ট্যযুক্ত এবং মিষ্টি কাণ্ডবিশিষ্ট বাজরার উপাদানও মূল্যায়ন করা হয়। এসব বৈশিষ্ট্য খাদ্য, পশুখাদ্য ও জৈববস্তু উৎপাদনের বাজারে বাড়তি মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

আইসিআরআইএসএটির উপমহাপরিচালক (গবেষণা ও উদ্ভাবন) ড. স্ট্যানফোর্ড ব্লেড বলেন, বাজরার জাত উন্নয়নের জন্য বিপুল জিনগত উপাদান রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক গবেষণা বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব উপাদান কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কৃষি পরিবেশের উপযোগী জাত উদ্ভাবনের সুযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কর্মসূচির পরিচালক ড. রমন বাবু বলেন, উন্নত হাইব্রিড জাত তৈরির জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী উপযুক্ত মাতৃ ও পিতৃ গাছের লাইন নির্বাচন এবং সেগুলোর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত মূল্যায়ন ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মতামত পরবর্তী গবেষণার জন্য উপযুক্ত উপাদান বাছাইয়ে সহায়তা করে।

আইসিআরআইএসএটির বাজরা প্রজনন বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী ড. এস কে গুপ্ত জানান, ২০২৪ সালের ফিল্ড ডেতে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে শস্যের রং, খরা সহনশীলতা, ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং পশুখাদ্যের গুণগত মান উন্নয়নে গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি ফরোয়ার্ড ও শাটল ব্রিডিংয়ের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে খরাপ্রবণ পরিবেশের উপযোগী অধিক উৎপাদনশীল জাতের উপাদান তৈরি করছে। ভারতের বাজরা বিষয়ক সর্বভারতীয় সমন্বিত গবেষণা প্রকল্পের (এআইসিআরপি) নির্ধারিত এ১ অঞ্চলও এ গবেষণার আওতায় রয়েছে।

ফিল্ড ডেতে অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীরা অপেক্ষাকৃত খাটো ও আগাম পরিপক্ব পিতৃ-মাতৃ লাইন উদ্ভাবনের সুপারিশ করেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের জাত গাছ হেলে পড়ার ঝুঁকি কমাবে এবং যন্ত্রের সাহায্যে ফসল কাটার সুবিধা তৈরি করবে। এতে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি শ্রম ব্যয়ও কমতে পারে।

আইসিআরআইএসএটি জানিয়েছে, তাদের চলমান গবেষণার লক্ষ্য এমন উন্নত বাজরার জাত উদ্ভাবন, যা কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানো, ভালো দাম পাওয়া এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করবে। ভারত, আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যান্য শুষ্ক অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় এসব জাত ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: গ্লোবাল এগ্রিকালচার