কৃষি খবর ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছেন কৃষকেরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক ধান চাষ কমিয়ে সয়াবিনের মতো তুলনামূলক কম ব্যয়ের ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে বাড়তি ব্যয় ও কৃষি খাতের অনিশ্চয়তা দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে কৃষকদের ভোটের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান অঞ্চলে কৃষকদের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষক পল ম্যাককিনির পরিবার চার প্রজন্ম ধরে ধান চাষ করছে। তবে আগামী বছর তাঁদের খামারে ধানের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবর্তে তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করা যায় বলে সয়াবিন চাষে বেশি গুরুত্ব দেবেন তাঁরা।

ম্যাককিনির মতো যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কৃষকই জ্বালানি ও সারের বাড়তি দামের কারণে ফসল নির্বাচনে পরিবর্তন আনছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরুর পর এসব উপকরণের দাম আরও বেড়েছে। এর আগে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ২০২৫ সালের শুল্কসংক্রান্ত অস্থিরতাও কৃষি উপকরণের দাম ও বাজারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলে খরা।

আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগের সম্প্রসারণ অর্থনীতিবিদ রায়ান লয় বলেন, সয়াবিন তুলনামূলক কম উপকরণনির্ভর ফসল। ফলে লোকসান এড়ানো বা উৎপাদন খরচের সঙ্গে আয় সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এটি কৃষকদের জন্য কিছুটা সুবিধাজনক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঙ্গরাজ্য আরকানসাসে বর্তমানে ১৯৭০-এর দশকের পর সবচেয়ে কম জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। অনেক কৃষক আশা করেছিলেন, ২০২৬ সালে পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার ধান চাষ বাড়াতে পারবেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বসন্তকালীন রোপণ মৌসুমে সার প্রয়োগের সময়ই সারের দাম বেড়ে যায়।

এ পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃষকদের জন্য ৮০০ কোটি ডলারের জ্বালানি সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর আগে ২০২৫ সালে শুল্কসংক্রান্ত ক্ষতি সামাল দিতে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে আরকানসাসের কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যয়ের তুলনায় নতুন সহায়তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরকানসাস ফার্ম ব্যুরোর সদস্য পল ম্যাককিনি সহায়তা ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও তিনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, কৃষকদের প্রতিনিয়ত টিকে থাকার লড়াই থেকে বের করে আনতে কার্যকর উদ্যোগ দরকার।

কৃষি খাতের সংকটের প্রভাব পড়েছে খামারের আর্থিক অবস্থাতেও। আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল ল সেন্টারের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি খামারের দেউলিয়া হওয়ার ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৭৩ শতাংশ।

কৃষি সংকট ঘিরে নির্বাচনী লড়াই

এদিকে কৃষকদের অর্থনৈতিক সংকটকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন আরকানসাসের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হ্যালি শফনার। ষষ্ঠ প্রজন্মের কৃষক শফনার গত বছর পরিবারের প্রায় ২ হাজার একরের খামারের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ফসলের দাম কমে যাওয়া এবং বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে খামার পরিচালনা আর লাভজনক থাকছিল না বলে জানান তিনি।

পরিবারের জমি ও বাবা-মায়ের অবসরজীবনের আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষায় খামার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন শফনার। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী সিনেটর টম কটনের বিরুদ্ধে লড়ছেন।

শফনার বলেন, কৃষিকাজ করতে না পারলেও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় তিনি লড়াই করতে চান। নির্বাচিত হলে ইরান যুদ্ধ বন্ধ, কৃষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারে—এমন বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন, স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণব্যবস্থায় বিনিয়োগ এবং কার্যকর কৃষি বিল পাসের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

তবে আরকানসাসের মতো গ্রামীণ ও কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের অবস্থান ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী। ফলে শফনারের জন্য জয় পাওয়া কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে টেক্সাস ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট আসন পাওয়ার সম্ভাবনা এবং গ্রামীণ আসনগুলোতে ভোটের পরিবর্তনও নির্বাচনী বিশ্লেষকদের নজরে রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষকদের সামনে এখন শুধু কোন ফসল চাষ করবেন, সেই সিদ্ধান্তই নয়; বরং কৃষি খাতের ভবিষ্যৎ কোন রাজনৈতিক নীতির মাধ্যমে সুরক্ষিত হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃষক পল ম্যাককিনির মতো অনেকেই চান, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও অনিশ্চয়তা সেই ভবিষ্যৎকে কঠিন করে তুলছে।

সূত্র: আল জাজিরা