কৃষি খবর ডেস্ক: গরু কেনার সামর্থ্য না থাকায় নিজেরাই ঘানি টেনে জীবিকার চাকা সচল রেখেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের শম্ভু পদ সাহা ও তার স্ত্রী গাজলী রানী সাহা। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই কাঠের ঘানিই এখনো তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

তবে বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর, কমেছে কর্মক্ষমতা। ফলে আগের মতো আর তেল তৈরি করতে পারেন না তারা। তাই শেষ বয়সে ঘানি টানার কষ্ট কিছুটা কমাতে একটি গরুর প্রত্যাশায় দিন গুনছেন এই দম্পতি। শম্ভু পদ সাহা ও গাজলী রানী সাহা উপজেলার উপজেলার হাজারবিঘী গ্রামের বাসিন্দা।

শম্ভু সাহা বলেন, ‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরি করছি। এই কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করি এবং পরিবারের খরচ চালাই। তিন সন্তানদেরও মানুষ করেছি এর টাকা থেকেই। কিন্তু ঘানি টানার জন্য আমার কোনো গরু নেই। তাই বাধ্য হয়েই নিজের বুকের শক্তিতে পাঁচ মণ ওজনের পাথর বোঝাই কাঠের ঘানি টেনে সরিষা মাড়াই করতে হয়। শোবার ঘর নেই। তাই এক ঘরেই ঘানি স্থাপন করতে হয়েছে।’

শম্ভু সাহার স্ত্রী গাজলী রানী সাহা বলেন, ‘গরুর অভাবে প্রায় পাঁচ মণ ওজনের পাথরবোঝাই কাঠের ঘানি আমাদের নিজেদেরই টানতে হয়। আমার স্বামী যখন বুকের শক্তি দিয়ে এত ভারী ঘানি টানেন, তখন তার কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগে। এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। তাই স্বামীর কষ্ট কিছুটা কমাতে আমিও তার সঙ্গে ঘানি টানার কাজে সহযোগিতা করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর নিজের টাকায় সরিষা কেনারও সামর্থ্য নেই। তাই অন্যের সরিষা মাড়াই করে যা পাওয়া যায়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চালাতে হয়। সরিষা মাড়াইয়ের পর যে খৈল পাওয়া যায়, সেটাই আমাদের আয়ের অন্যতম ভরসা। সংসারের খরচ চালানো, খাবার জোগাড় করা সবকিছুই আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। এত পরিশ্রম করার পরও আয় খুব বেশি হয় না। তারপরও পেটের দায়ে কাজ করে যেতে হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আধুনিক যন্ত্রে উৎপাদিত সরিষার তেলের তুলনায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানিতে তৈরি তেলের প্রতি মানুষের আলাদা আগ্রহ রয়েছে। শম্ভু সাহা দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের কোনো জমিজমা নেই, আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত। এ কারণে একটি গরু কিনে ঘানি টানার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই নিজেদের শারীরিক শক্তি দিয়ে প্রায় পাঁচ মণ ওজনের পাথরবোঝাই ঘানি টানতে হচ্ছে। তাদের এই কষ্ট সত্যিই কষ্টদায়ক।’

দ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াই করে তেল উৎপাদন আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। আধুনিক প্রযুক্তির এই সময়ে এমন ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। তাই এই ঘানি টিকিয়ে রাখা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগকে বাঁচিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা আর্থিক সংকটের কারণে ঘানি টানার জন্য গরু কিনতে পারছেন না, তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’

শুধু শম্ভু সাহা নন, তার দুই ভাই হরিপদ সাহা ও তারাপদ সাহাও একইভাবে বুকের শক্তিতে কাঠের ঘানি টেনে সরিষা পিষে আয় করছেন। এ আয় দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালিয়ে আসছেন তিন ভাই।

সূত্র: জাগো নিউজ