কৃষি খবর ডেস্ক: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার জরমনদী গ্রামে একসময় শিম চাষ হতো হাতে গোনা কয়েকটি বাড়িতে। প্রতিবেশীর কাছ থেকে বীজ নিয়ে শুরু করা সেই চাষ এখন গ্রামের অনেক পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। বর্তমানে গ্রামের অন্তত ২০টি পরিবার প্রায় ৩৫ বিঘা জমিতে শিম চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। শিম চাষে বদলে গেছে তাদের জীবনযাত্রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৬ বছর আগে গ্রামের দহবন্দ ইউনিয়নের জরমনদী গ্রামের মো. নাছির উদ্দিন তার শ্বশুরবাড়ি নাটোর থেকে পুঁটি জাতের শিমের বীজ নিয়ে আসেন। প্রথমে বাড়ির উঠানে মাচা তৈরি করে শিম চাষ শুরু করেন তিনি। পরের বছর প্রতিবেশী আবু তালেব মিয়া তার কাছ থেকে বীজ নিয়ে বাড়ির সামনের ১০ শতক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে শিম চাষ শুরু করেন।
প্রথম বছর তেমন লাভ না হলেও হাল ছাড়েননি আবু তালেব। পরের বছর জমির পরিমাণ বাড়িয়ে ২০ শতকে শিম চাষ করেন। এতে খরচ বাদে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ হয় তার। এরপর আবু তালেবের আপন তিন ভাই ও চার চাচাতো ভাই শিম চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে গ্রামের অন্যরাও এ চাষে যুক্ত হন। এভাবেই জরমনদী গ্রাম পরিচিতি পায় শিমচাষিদের গ্রাম হিসেবে।
বর্তমানে গ্রামের নুরুন্নবী মিয়া, আবু তালেব মিয়া, আলম মিয়া, সাইদুজ্জামান মিয়া, আতাউর রহমান, বাবলু মিয়া, নুরুন্নবী সরকার, মোনারুল ইসলাম, বিধান চন্দ্র ও আনিছুর রহমানসহ অন্তত ২০টি পরিবার শিম চাষ করছেন। তাদের চাষের জমির পরিমাণ প্রায় ৩৫ বিঘা।
আবু তালেব বলেন, প্রতিবেশী নাছিরের শিম চাষ দেখে তিনি এ ফসলের প্রতি আগ্রহী হন। এরপর বাণিজ্যিকভাবে শিম চাষ শুরু করেন। শুরুতে মাচা তৈরির জন্য প্রায় পাঁচ হাজার টাকার বাঁশ কিনতে হয়েছিল। বর্তমানে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে জিআই তার ব্যবহার করে মাচা তৈরি করছেন। এতে খরচ কমেছে, পাশাপাশি মাচাও বেশি টেকসই হচ্ছে।
গ্রামের আরেক চাষি সাইদুজ্জামান মিয়া চলতি মৌসুমে প্রায় দুই বিঘা জমিতে সাটিয়া জাতের শিম চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ জমি থেকে প্রায় তিন লাখ টাকার শিম বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাস শিম বিক্রি চলবে।
সাইদুজ্জামান বলেন, জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ফলন পাওয়া পর্যন্ত শিমক্ষেতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। প্রতিদিন সকাল-বিকেল গাছের পরিচর্যা করতে হয়। শিমের ডালের আগা খুলে দেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং মাঝে মাঝে সেচ দিতে হয়। দিনমজুরের কাজের পাশাপাশি নিজেরাও নিয়মিত ক্ষেতের পরিচর্যা করেন তারা
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিম, বেগুন, পটল, করলা, বরবটি, মুলা, ঢ্যাঁড়শ, ফুলকপি, কচু, কুমড়া ও লাউ। এসব সবজির বড় একটি অংশ উৎপাদিত হচ্ছে তিস্তার চরাঞ্চলে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত শ্রাবণ থেকে ভাদ্র মাস (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) শিম চাষের উপযুক্ত সময়। বীজ রোপণের ৪৫ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে গাছে ফলন আসতে শুরু করে।
পাইকার আশরাফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় উৎপাদিত সবজি দিয়ে সারা বছর জেলার চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। শীতকালে চার থেকে পাঁচ মাস কিছু স্থানীয় সবজি পাওয়া গেলেও পরে বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে মরিচ, পেঁয়াজ, গাজর, বেগুন, করলা ও কুমড়া বাইরে থেকে আনতে হয়। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকেরাও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে চান না।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, শাকসবজি উঁচু জমির উপযোগী ফসল। তুলনামূলক কম খরচে এসব ফসল থেকে ভালো মুনাফা পাওয়া সম্ভব। তবে চাষিদের নিয়মিত সময় দিতে হয় এবং নিবিড় পরিচর্যা করতে হয়।
তিনি বলেন, সুন্দরগঞ্জের বেশ কিছু এলাকা শাকসবজি চাষের জন্য উপযোগী। বিশেষ করে তিস্তার চরাঞ্চলে বর্তমানে ব্যাপক সবজি আবাদ হচ্ছে। জরমনদী গ্রামেও দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন কৃষক শিম চাষ করছেন। একজনকে দেখে অন্যরাও এ চাষে আগ্রহী হয়েছেন। কৃষি অধিদপ্তর থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
একজনের উদ্যোগে শুরু হওয়া শিম চাষ এখন জরমনদী গ্রামের ২০টি পরিবারের জীবিকার অবলম্বন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এ ফসল শুধু কৃষকদের স্বাবলম্বীই করছে না, একই সঙ্গে সুন্দরগঞ্জের সবজি উৎপাদনেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সূত্র: সমকাল



