কৃষি খবর ডেস্ক: ইথিওপিয়ার মধ্যাঞ্চলের হাদিয়া অঞ্চলের মিশা জেলার উঁচু ভূমিতে জীবনের বেশির ভাগ সময় কৃষিকাজ করে কাটিয়েছেন আয়েলে তিবেবু। পাঁচ সন্তানের জনক এই কৃষক জমিতে কঠোর পরিশ্রম করেও প্রত্যাশিত সাফল্য পাচ্ছিলেন না। উন্নতমানের পশুখাদ্যের সংকট এবং গবাদিপশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় ক্রমবর্ধমান ব্যয় তাঁর অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আয়েলে বলেন, “উন্নতমানের পশুখাদ্য ছাড়া আমরা এগোতে পারছিলাম না। এতে দুধ ও মাংসের সরবরাহ ব্যাহত হতো। পরিবারের জন্য পুষ্টিকর প্রাণিজ খাদ্য নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।”
ইথিওপিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এ সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুম এবং উন্নত জাতের বীজ ও চারা পাওয়ার সীমিত সুযোগের কারণে পশুখাদ্যের সংকট ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। এতে খাদ্য ও আয়ের জন্য গবাদিপশুর ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র কৃষকেরা বাড়তি চাপে পড়ছেন।
ছোট উদ্যোগেই বড় সম্ভাবনা
২০২৪ সালে প্রচলিত কৃষিকাজের বাইরে নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন আয়েলে। তাঁর সমবায়ের পশুখাদ্য উৎপাদনকারী ঘাসের বীজ চাষে প্রাথমিক সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে ওটস চাষ শুরু করেন তিনি।
যত্নসহকারে চাষ করার পর মৌসুম শেষে ৬০০ কেজি উন্নতমানের ওটসের বীজ উৎপাদন করেন। এলাকায় উন্নত পশুখাদ্যের বীজের চাহিদা বেশি থাকায় পুরো উৎপাদনই বিক্রি হয়ে যায়। এতে তাঁর আয় হয় ৪৫ হাজার ইথিওপীয় বির (প্রায় ২৮৮ মার্কিন ডলার)।
প্রথম বছরের এই সাফল্য তাঁকে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। ২০২৫ সালে ওটসের বীজ উৎপাদনের জমি বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৩৭৫ হেক্টর করেন তিনি। ওই বছর উৎপাদন হয় ৯০০ কেজি বীজ।
এদিকে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বীজের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। প্রতি টন বীজের দাম দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার ইথিওপীয় বিরে (প্রায় ৭৭০ মার্কিন ডলার)। ফলে পশুখাদ্যের বীজ উৎপাদন দ্রুতই আয়েলের খামারের অন্যতম লাভজনক কার্যক্রমে পরিণত হয়।
খামার ও পরিবারের উন্নয়নে বিনিয়োগ
পশুখাদ্যের বীজ বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ এবং পরিবারের অন্যান্য আয়ের একটি অংশ খামারের উন্নয়নে বিনিয়োগ করেন আয়েলে। তিনি একটি বলদ কেনেন। ফলে জমি চাষের জন্য অন্যের কাছ থেকে বলদ ভাড়া নেওয়ার প্রয়োজন আর থাকছে না।
পরিবারের দুধের সরবরাহ বাড়াতে কেনেন জার্সি জাতের একটি বকনা বাছুর। পাশাপাশি আয়ের উৎস ও পরিবারের পুষ্টির বৈচিত্র্য বাড়াতে অ্যাভোকাডোর মতো উচ্চমূল্যের ফলের গাছও লাগিয়েছেন তিনি।
এখন সার ও উন্নত বীজ কেনার মতো প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে তাঁকে আগের মতো আর্থিক সংকটে পড়তে হয় না। নিয়মিত আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস তৈরি হয়েছে তাঁর।
নিজের গবাদিপশুর খাদ্য ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এনেছেন আয়েলে। বাড়ির আশপাশে তিনি ফ্যালারিস, গুয়াতেমালা ঘাস, হাতিঘাস ও দেশো ঘাসসহ কয়েক ধরনের উন্নত পশুখাদ্য উৎপাদনকারী ঘাস চাষ করছেন।
এসব ঘাসের বৃদ্ধির মৌসুম ভিন্ন হওয়ায় সারা বছরই তাঁর গবাদিপশুর জন্য পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়া যায়। বৃষ্টি কম হলে কিংবা দেরিতে শুরু হলেও এতে খামারের ঝুঁকি কমে। দেশো ঘাসের মতো বহুবর্ষজীবী ঘাস জমির ওপর আচ্ছাদন তৈরি করে রাখে, যা ঢালু জমিতে মাটির ক্ষয় কমাতেও সাহায্য করে।
আয়েলে বলেন, “আমি খুব অল্প জমি দিয়ে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সেই ছোট উদ্যোগই আমার পরিবারের জন্য আরও নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ খুলে দিয়েছে।”
বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ পশুখাদ্যের বীজ উৎপাদন
আয়েলের এই সাফল্য পশুখাদ্যের বীজকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। আন্তর্জাতিক প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএলআরআই) ‘টিএএটি-২’ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ উদ্যোগের আওতায় কৃষকেরা গবেষণা কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবিত উন্নতমানের বীজ ও কাটিং বা চারা পান। পাশাপাশি বীজ উৎপাদন, মান সনদ গ্রহণ এবং বাজারজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মধ্য ইথিওপিয়া অঞ্চলে আইএলআরআইয়ের অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান লিচা ফার্মার্স ইউনিয়ন। এর আওতায় রয়েছে ৮৩টি প্রাথমিক কৃষক সমবায়, যেগুলোর সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।
এই সমবায়গুলোর একটি গোমবোরা প্রাথমিক সমবায়। আয়েলে এ সমবায়ের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সমবায়ের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে ২৫ হেক্টর জমিতে পশুখাদ্যের বীজ উৎপাদন করেছেন। তাঁদের যৌথ উৎপাদন ছিল ১৯ মেট্রিক টন মান ঘোষিত বীজ (কিউডিএস)।
আঞ্চলিক কৃষি উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণ ও কোয়ারেন্টিন কর্তৃপক্ষ বীজের মানদণ্ড নির্ধারণ করে এবং সেগুলো যাচাই করে। এর ফলে নির্ধারিত মান পূরণ করা বীজই কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়।
বীজের মান নিশ্চিতকরণ, সনদ গ্রহণ এবং নির্ভরযোগ্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায় সমবায়ের সদস্যরা তাঁদের উৎপাদিত বীজের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন।
আইএলআরআইয়ের সমাজবিজ্ঞানী মিলিয়ন গেব্রে বলেন, “মান নিশ্চিতকরণ এবং নির্ভরযোগ্য বাজারই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। কৃষকেরা যখন এ দুটির ওপর আস্থা পেয়েছেন, তখন তাঁরা বীজ উৎপাদনে নিজেদের জমি ও সময় বিনিয়োগ করেছেন।”
বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা
২০২৭ সালের মৌসুমে ওটসের বীজ উৎপাদনের জমি শূন্য দশমিক ৫ হেক্টরে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছেন আয়েলে। একজন আদর্শ কৃষক হিসেবে তিনি প্রতিবেশীদের দেখাচ্ছেন, পশুখাদ্যের বীজ শুধু গবাদিপশুর খাদ্য নয়, এটি লাভজনক ব্যবসারও সুযোগ।
মিলিয়ন গেব্রে বলেন, “এটি ইথিওপিয়ার প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কৃষকেরা যখন পশুখাদ্যের বীজকে বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন তাঁরা স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে উন্নতমানের পশুখাদ্যের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত হয়, যা প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ভিত্তি।”
আইএলআরআইয়ের ফসল ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী কিন্দু মেকোনেন বলেন, পশুখাদ্যের বীজ বাণিজ্যিকীকরণের এ পরীক্ষামূলক উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত পশুখাদ্য উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে গবেষক ও সরকারকে কাজ করতে হবে।
তাঁর মতে, উন্নতমানের পশুখাদ্যের প্রাপ্যতা এবং নির্ভরযোগ্য বাজারসংযোগের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। গ্রামীণ, শহরতলি ও শহরাঞ্চলের দুগ্ধ উৎপাদন ব্যবস্থার পাশাপাশি গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ খাতেও এ সংকট রয়েছে।
বাণিজ্যিকভাবে পশুখাদ্যের বীজ উৎপাদন জোরদার করা গেলে কৃষকদের জন্য নিয়মিত বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পশুখাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।
মেকোনেনের মতে, প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকলে কৃষকেরা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় পশুখাদ্যের বীজ উৎপাদন করতে পারেন। পরবর্তী ধাপে এ উদ্যোগকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিতে অঞ্চল ও প্রাদেশিক পর্যায়ের সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। ওরাবে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে প্রাথমিক পর্যায়ের উন্নত বীজ উৎপাদনের সঙ্গে সংগঠিত বীজ উৎপাদক সমিতিগুলোর সংযোগ আরও শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নত পশুখাদ্য জলবায়ুর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
উন্নত পশুখাদ্যের প্রভাব শুধু উৎপাদন ও কৃষকের আয় বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়; জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাতেও এর ভূমিকা রয়েছে।
কিন্দু মেকোনেন বলেন, “উন্নত পুষ্টি পাওয়া গবাদিপশু বেশি উৎপাদন দেয়। ফলে প্রতি লিটার দুধ বা প্রতি কেজি মাংস উৎপাদনে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমে আসে। স্থানীয়ভাবে নির্ভরযোগ্য বীজ সরবরাহ থাকলে কৃষকেরা প্রয়োজনের সময়ই পশুখাদ্য চাষ করতে পারেন। প্রতিকূল মৌসুমে দূরবর্তী উৎস থেকে বীজ আসার অপেক্ষায় থাকতে হয় না।”
আয়েলে তিবেবুর অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, উন্নত পশুখাদ্যের বীজ উৎপাদন ক্ষুদ্র কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি গবাদিপশুর পুষ্টি, পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা এবং খামারের স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বেশি কৃষকের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।






