কৃষি খবর ডেস্ক: রোগ প্রতিরোধী ও উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবনে গবেষকদের দক্ষতা বাড়াতে এক মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করেছে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (সিমিট)। ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা এ প্রশিক্ষণে আর্জেন্টিনা, ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের ১০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী যুক্ত হন।

মেক্সিকোর টোলুকায় সিমিটের সানজায়া রাজরাম পরীক্ষণকেন্দ্র এবং টেক্সকোকোর এল বাতান এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তরে এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে গমের বিভিন্ন জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের উৎপাদন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

টোলুকা এ ধরনের প্রশিক্ষণের জন্য উপযোগী স্থান। এখানকার পরিবেশে গমের হলুদ মরিচা রোগ, সেপ্টোরিয়া এবং ফিউজেরিয়াম হেড ব্লাইটের মতো রোগের বিরুদ্ধে গমের প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষা করা যায়। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধের সম্ভাবনাময় জিনগত উৎসও শনাক্ত করা সম্ভব।

রোগজীবাণু সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ফলে বর্তমানে কার্যকর কোনো রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভবিষ্যতে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে নিয়মিতভাবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষা করা জরুরি। কৃষিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি রোগের প্রভাব মূল্যায়ন করলে এমন গমের জাত উদ্ভাবন সহজ হয়, যেগুলো রোগের চাপের মধ্যেও ফলন ধরে রাখতে পারে।

মাঠপর্যায়ে গমের জাত নির্বাচন ও রোগ নির্ণয়ের প্রশিক্ষণ

প্রশিক্ষণের শুরু থেকেই মাঠপর্যায়ের কাজে অংশ নেন গবেষকেরা। তাঁরা গমের এফ৩ প্রজন্মের উদ্ভিদসমষ্টি থেকে উপযোগী গাছ নির্বাচন করেন, বিভিন্ন প্রজনন উপকরণ ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং সিমিটের প্রজননবিদ ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

এফ৩ হলো দুটি ভিন্ন গমের জাতের মধ্যে সংকরায়ণের পর তৃতীয় প্রজন্ম। এ পর্যায়ে বংশগত বৈশিষ্ট্যের বিভিন্নতা দেখা দেয়। ফলে কোন গাছগুলোতে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা শনাক্ত করে পরবর্তী প্রজনন ধাপে এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধরনের মাঠপর্যায়ের কাজের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা শিখেছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্মে উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হওয়ার মধ্য থেকে কীভাবে সম্ভাবনাময় গাছ নির্বাচন করতে হয়। পাশাপাশি মাঠের পর্যবেক্ষণ কীভাবে পরবর্তী গবেষণা ও জাত নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, সে বিষয়েও তাঁরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে টোলুকায় আয়োজিত সিমিটের ‘হুইট ফিল্ড ডে’ বা গমবিষয়ক মাঠ দিবসেও অংশ নেন গবেষকেরা। সেখানে গমের উন্নয়নে প্রজননবিদ্যা, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পান তাঁরা।

মাঠপর্যায়ে চলমান গবেষণা সরাসরি দেখার মাধ্যমে গমের একটি গাছ নির্বাচন থেকে শুরু করে উন্নত জিনগত উপকরণ তৈরি ও মূল্যায়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন অংশগ্রহণকারীরা।

চার দেশের গবেষকদের অভিজ্ঞতা বিনিময়

চারটি দেশের অংশগ্রহণকারীরা ভিন্ন ভিন্ন গম উৎপাদন পরিবেশ ও গবেষণাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশিক্ষণে যোগ দেন। তাঁরা নিজ নিজ দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি সিমিটে শেখা পদ্ধতিগুলো কীভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার, সক্ষমতা ও সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রশিক্ষণের সুফল তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফিরে পরিচালিত গবেষণাতেও কাজে লাগবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে গাছ নির্বাচনের পদ্ধতি প্রয়োগ এবং উদ্ভিদ প্রজননবিদ ও রোগতত্ত্ববিদদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদনশীল ও রোগ প্রতিরোধী গমের জাত উদ্ভাবন আরও কার্যকর হতে পারে।

এ ছাড়া সিমিট এবং প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া অন্য গবেষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন গবেষণাসংক্রান্ত প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক শেখার সুযোগ বজায় থাকবে।

সিমিটের এ ধরনের প্রশিক্ষণ গমের উন্নয়ন গবেষণাকে কৃষকের মাঠের উপযোগী উন্নত জাত উদ্ভাবনে রূপ দিতে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলছে।