কৃষি খবর ডেস্ক: রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় কৃষ্ণসাগরজুড়ে নৌবাণিজ্যিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। এতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের গম রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ন্যাটোর মধ্যেও, আর আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।

সর্বশেষ ১৫ অক্টোবর ভোরে রোমানিয়ার সুলিনা খালের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ১৩ নটিক্যাল মাইল দূরে সান মারিনোর পতাকাবাহী রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার ‘ওয়াইন ট্রেডার’-এ আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় জাহাজটির সাতজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। এর আগের দিন একই জলসীমার কাছে কোমোরোসের পতাকাবাহী ‘ইয়ারা জে’ জাহাজে হামলা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক সম্মেলনে রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুসর দান বলেন, “দুটি ড্রোন জাহাজ দুটিতে আঘাত করেছে।” উত্তাল সমুদ্রের কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। পরে রোমানিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিকিৎসক দলসহ দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ও দুটি উদ্ধারকারী নৌযান পাঠায়।

এর আগে ১৩ অক্টোবর বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে ডুবে যায় গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘এইচএস ডিগনিটি’। রোমানিয়ার ব্রেইলা বন্দরের দিকে যাওয়ার পথে ক্রাপেতস গ্রামের কাছাকাছি জাহাজটি ডুবে যায়। এতে ১১ জন নাবিক নিখোঁজ হন।

বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ হামলাটিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষ্য, এ ঘটনার ফলাফল রাশিয়ারই স্বার্থে যাচ্ছে। তবে বুলগেরিয়া সরাসরি মস্কোকে দায়ী না করে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে।

এর এক সপ্তাহ আগে, ৬ অক্টোবর বুলগেরিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে আরও দুটি জাহাজে ড্রোন হামলা হয়। টোগোর পতাকাবাহী ‘আলফা ওয়াতান’ ডুবে যায়। অন্যদিকে গমবাহী পালাউয়ের পতাকাবাহী ‘অ্যাবল’ জাহাজে আগুন ধরে যায়। পরে জাহাজটির ১৮ জন নাবিককে সরিয়ে নেওয়া হয়।

যুদ্ধের বিস্তার, উদ্বেগে ন্যাটো

এত দিন ইউক্রেন ও রাশিয়ার বন্দর এবং দেশ দুটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জাহাজগুলোতেই হামলার ঘটনা বেশি ঘটছিল। কিন্তু রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার কাছে দানিয়ুব নদীর প্রবেশপথসংলগ্ন এলাকায় সাম্প্রতিক হামলা সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার ঘটিয়েছে। এতে ন্যাটোর উদ্বেগ বেড়েছে।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে হামলাগুলো নিয়ে রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুসর দান ও বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। কৃষ্ণসাগরে নৌযান চলাচলের ওপর নজরদারি জোরদার করতে বুলগেরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিমিতার স্তোয়ানোভ রোমানিয়া ও তুরস্কের প্রতিপক্ষদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।

তবে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কোনো দেশই সরাসরি রাশিয়াকে হামলার জন্য দায়ী করেনি। এতে সংঘাত আরও বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে দেশ দুটির সতর্ক অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

পাল্টাপাল্টি হামলার সূত্রপাত যেভাবে

চলতি বছরের গ্রীষ্ম থেকেই হামলার ধারাবাহিকতা বাড়তে থাকে। জুলাইয়ের শুরুতে ইউক্রেনের নৌবাহিনী গভীর এলাকায় অভিযান চালানো শুরু করে। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার পতাকাবাহী এবং তৃতীয় দেশের কিছু জাহাজ ইউক্রেন থেকে চুরি করা শস্য পরিবহন করছে অথবা রাশিয়ার সামরিক তৎপরতায় সহায়তা দিচ্ছে।

ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী, অভিযানের প্রথম দুই সপ্তাহেই শতাধিক জাহাজ হামলার শিকার হয়। এরপর রাশিয়া ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোতে পাল্টা হামলা শুরু করে। পাশাপাশি রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার কাছাকাছি জাহাজ এবং নৌপথও ক্রমে হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।

এতে ইউক্রেনের দানিয়ুব নদীকেন্দ্রিক রপ্তানি পথটি বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ইউক্রেনের প্রধান কৃষ্ণসাগরীয় রপ্তানি করিডর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই পথ দিয়েই দেশটির শস্যের একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাচ্ছিল।

রাশিয়া-ইউক্রেনের গম রপ্তানি কমছে

জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে। রাশিয়াভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সোভইকনের (SovEcon) মতো একাধিক বিশ্লেষক সংস্থা আগস্টের শেষ দিকে পূর্বাভাস দিয়েছিল, সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার গম রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।

তবে প্রকৃত রপ্তানি আরও বেশি কমে থাকতে পারে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী জানিয়েছে। ইউক্রেনের পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীগুলোর হিসাব অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাশিয়ার গম রপ্তানি প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ইউক্রেনের গম রপ্তানিও প্রায় অর্ধেকে নেমেছে বলে তাদের অনুমান।

এদিকে অক্টোবরের প্রথম ও মধ্যভাগে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো, কানসাস সিটি ও মিনিয়াপোলিসের গমের ভবিষ্যৎ সরবরাহভিত্তিক বাণিজ্য চুক্তির দাম বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে শীতকালীন গমের বীজ বপনের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকাও দামের ঊর্ধ্বগতিতে ভূমিকা রাখছে।

নতুন নৌবাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ

কৃষ্ণসাগরে নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও তুরস্ক নতুন একটি নৌবাণিজ্যিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০২২ সালে তুরস্কের মধ্যস্থতায় হওয়া কৃষ্ণসাগরীয় শস্য চুক্তি স্বাক্ষরের এক বছরের মধ্যেই ভেঙে পড়ে।

বর্তমানে ওই চুক্তির বিকল্প কোনো কাঠামো কার্যকর নেই। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই নতুন এলাকায় হামলা সম্প্রসারণে প্রস্তুত বলে পরিস্থিতি থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে কৃষ্ণসাগরে নিরাপদ নৌযান চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দুই দেশের শস্য রপ্তানি স্বাভাবিক করা এবং আন্তর্জাতিক গমের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। সূত্র: গ্লোবাল অ্যাগ্রিকালচার