কৃষি খবর ডেস্ক: এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব ও বৈশ্বিক অস্থিরতায় কৃষি উৎপাদন, কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম ক্রয় পরিকল্পনা, মজুত ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে ফিলিপাইনভিত্তিক আঞ্চলিক খাদ্য ও কৃষিবাণিজ্য প্রতিষ্ঠান অ্যাবোইটিজ ফুডস।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পণ্যবাজার, পণ্য পরিবহনের পরিস্থিতি এবং উৎপাদনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। এতে খাদ্য উৎপাদক ও কৃষিবাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

ফিলিপাইনের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে দেশটিতে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ ছাড়া কৃষি খাতে ৬৫ লাখ ফিলিপাইন পেসোর ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের তথ্য পাওয়া গেছে।

অ্যাবোইটিজ ফুডসের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট টেডি ডিওকারেস বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা বলতে শুধু বর্তমান সময়ে পর্যাপ্ত খাবার থাকা বোঝায় না। নির্ভরযোগ্যভাবে খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণ করা, বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি

আটটি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে অ্যাবোইটিজ ফুডস। সরবরাহকারীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে পণ্যের বাজারদর পর্যবেক্ষণ, আগাম ক্রয় পরিকল্পনা, পরিবহন ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রাপ্যতা যাচাই এবং নির্দিষ্ট পণ্যের মজুতের চাহিদা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পানির প্রাপ্যতা ও পশুখাদ্যের গুণগত মানের মতো বিষয়গুলোও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকেরা যেন নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

টেডি ডিওকারেস বলেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন আগেভাগে পর্যবেক্ষণ, ক্রয় ও পরিবহন পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য বিঘ্ন কমানোর চেষ্টা চলছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গ্রাহকেরা কীভাবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ুজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও জ্বালানি, পণ্য পরিবহন ও কাঁচামালের ব্যয় বাড়াচ্ছে। এতে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

ফিলিপাইনের শূকর উৎপাদনকারীদের অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। খামার পর্যায়ে শূকরের বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েন। এতে খামার পরিচালনা অব্যাহত রাখা ও নতুন করে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাংসের সরবরাহেও।

ডিওকারেস বলেন, খাদ্যব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন খরচ, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং ভোক্তাদের খাদ্য কেনার সামর্থ্য সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন শক্তিশালী করা এবং সরবরাহব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।

পশুখাদ্য উৎপাদন বাড়াতে নতুন কারখানা

উৎপাদন ও বিতরণ সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে অ্যাবোইটিজ ফুডস ফিলিপাইনের সেবু প্রদেশের বালামবান এলাকায় ওয়েস্ট সেবু এস্টেটে একটি নতুন পশুখাদ্য কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাবিত কারখানাটি চালু হলে পশুখাদ্য উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি এটি ইলিগান সিটির বিদ্যমান কারখানার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। বর্তমান কারখানাটি ভিসায়াস ও মিন্দানাও অঞ্চলের গ্রাহকদের সেবা দেয়।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বিভিন্ন বাজারে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের নিরাপত্তামূলক মজুত বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি শুষ্ক আবহাওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী করতে স্থাপনাগুলোর উন্নয়ন এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনে পশুর উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন গ্রাহকদের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করা এবং জলবায়ু ও বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যেও পশুপুষ্টিপণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখা।

খাদ্যনিরাপত্তায় পুরো সরবরাহব্যবস্থার ভূমিকা

অ্যাবোইটিজ ফুডসের মতে, খাদ্যব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়। সরবরাহকারী, কৃষি উৎপাদক, সরকার ও ভোক্তা সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

টেডি ডিওকারেস বলেন, পরিবার পর্যায়েও খাদ্যের অপচয় কমানো, পানি ও খাবারের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত পণ্য মজুত করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখা সম্ভব।

প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, সংকটের সময় খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আগাম প্রস্তুতি, স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ এবং পুরো খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যক্রমের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অংশীদারত্ব উন্নয়নে কাজ করছে অ্যাবোইটিজ ফুডস।