কৃষি খবর ডেস্ক: সকাল ৬ টায় কক্সবাজারের চোঁয়ার ফাঁড়ি মাছের বাজারে। ঘাটে ভিড়তে শুরু করেছে শতাধিক নৌকা। প্রতিটিই ভরা মাছের ঝুড়ি দিয়ে। নৌকা থেকে মাছ নামাতেই শুরু হয় ক্রেতাদের ভিড়। এরপর চলে দর-কষাকষি ও বিক্রি। এভাবে চলে প্রায় তিন ঘণ্টা। এ সময়ের মধ্যেই বাজারটিতে বিক্রি হয় প্রায় ৫ কোটি টাকার মাছ।

বাজারটির জেলার নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নে। প্রতিদিন সকাল ৬টায় এখানে বাজার জমে। শেষ হয় সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে। বাজারটিতে চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার মানুষ নিয়মিত আসেন। এ বাজারের মাছ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার হয়ে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারসংলগ্ন খালের তীরে নৌকা ভিড়লেই মাছ কিনতে ছোটেন ক্রেতারা। কেউ জেলেদের কাছ থেকে সরাসরি মাছ কিনছেন, কেউ মাছ তুলে দিচ্ছেন শেডে থাকা আড়তদারদের কাছে। এরপর আড়তদার এসব মাছ নিলামে তুলে বিক্রি করছেন। সবচেয়ে বেশি দাম দেওয়া ক্রেতারাই এ মাছ কিনতে পারছেন।

বাজারটিতে সাধারণত ইলিশ, কোরাল, বাটা, ট্যাংরা, বাগদা, গলদাসহ বিভিন্ন জাতের চিংড়ি, দাতিনা, পাঙাশ, রুই, কাতলা, পাবদা, নাইলোটিকা, মৃগেলসহ নানান ধরনের মাছ পাওয়া যায়। বেশির ভাগ মাছেই বরফ দেওয়া থাকে না। তাজা মাছই আড়তে বিক্রি হয়। এ কারণে পুরো জেলায় এর আলাদা পরিচিতি রয়েছে।

বাজারে ২৪টি পাল্লা বা আড়ত রয়েছে। প্রতিটি আড়তে দিনে গড়ে ২০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। 

বাজারের আড়তদারদের একজন শাহেদুল ইসলাম (৬০)। তিনি জানান, তাঁর জন্মের আগে থেকেই বাজারটিতে মাছ বিক্রি হচ্ছে। দিন দিন এর পরিচিতি ছড়িয়েছে। মহেশখালী, চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে আসেন। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান।

মাছ বিক্রেতা মোহাম্মদ বাবুল (৪৫) বলেন, তাঁরা জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে আবার বাজারে বিক্রি করেন। মাছের ধরন ও আকার অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হয়। কোনো মাছ ২০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি, কোনোটি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি। বড় মাছের দাম আরও বেশি।

যেভাবে গড়ে ওঠে চোঁয়ার ফাঁড়ি বাজার

চোঁয়ার ফাঁড়ি বাজার কীভাবে গড়ে উঠেছে, এর কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় একাধিক জ্যেষ্ঠ বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বাজারের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৫০ সালের দিকে উপকূলের জলদাস সম্প্রদায়ের লোকজন চকরিয়া সুন্দরবন এলাকায় মাছ ধরতেন। পরে সেই মাছ এনে বিক্রি করতেন চোঁয়ার ফাঁড়ি বাজারে। ধীরে ধীরে তাঁদের সঙ্গে মুসলিম জেলেরাও মাছ ধরার কাজে যুক্ত হন।

পরে চকরিয়া সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশ ইজারা দিয়ে মাছের ঘের তৈরি করা শুরু হয়। তখন থেকেই মূলত এ বাজারে মাছের বেচাকেনা বাড়তে থাকে। প্রায় ২০ বছর আগে চকরিয়া উপজেলার চিরিংগা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনা, বুড়িপুকুর এলাকাতেও মাছের বাজার বসত। তবে চোঁয়ার ফাঁড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ার পর থেকে ওই দুই বাজারে আর মাছ বিক্রি হয় না।

মাতামুহুরী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল আমিন বলেন, এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মাছের বাজার চোঁয়ার ফাঁড়ি। মাছ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি চকরিয়ার বাইরের শৌখিন ক্রেতারাও এখানে মাছ কিনতে আসেন। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মাছ এখানে বিক্রি হয়।

মাছ কমেছে, দাম বেশি

এবার চকরিয়া ও মাতামুহুরী অঞ্চলে মাছের উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা। চলতি বছর জুলাই মাসের বন্যার কারণে এমনটা হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। তাঁর জানান, এ বন্যায় অনেক ঘেরের বাঁধ ভেঙে ও পানি উপচে মাছ বেরিয়ে গেছে।