বিশেষ প্রতিবেদন: তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে বছরে ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ২ হাজার ৭০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতির পরিমাণ ২০২৪ সালে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস, অকালমৃত্যু এবং বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাব্যয় হিসাব করে এ তথ্য উঠে এসেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের (কেএইচআই) এক প্রতিবেদনে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার ব্র্যাক সেন্টারে ‘মাল্টি-ডাইমেনশনাল হেলথ ইমপ্যাক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত। গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন কেএইচআইয়ের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০-এর দশকের তুলনায় ২০২০-এর দশকে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতা বাড়ায় শরীরের স্বাভাবিকভাবে তাপ বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে হৃদ্রোগ, কিডনি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
তাপপ্রবাহে নষ্ট ২ হাজার ৯৩০ কোটি কর্মঘণ্টা
গবেষণার হিসাবে, শুধু ২০২৪ সালেই অতিরিক্ত গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কোটি সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। হারানো কর্মঘণ্টার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সঙ্গে জড়িত কৃষক ও কৃষিশ্রমিকেরা। নির্মাণশ্রমিকসহ শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর পেশার মানুষও তীব্র গরমে কর্মক্ষমতা ও আয় হারাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে ডায়রিয়া ও তাপজনিত অবসাদের ঝুঁকিও বাড়ে। তবু দেশে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় নির্দিষ্ট জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা নেই এবং তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত।
ডেঙ্গু, বন্যা ও দূষণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, আগের চার সপ্তাহে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে প্রায় দুই সপ্তাহ পর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ২১ শতাংশ বেশি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ঢাকার বাইরের। তবে মোট মৃত্যুর ৫৭ থেকে ৬৪ শতাংশ ঘটেছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে।
২০২৩ সালে শুধু হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অন্যদিকে, বন্যায় পানীয় জল দূষিত হওয়া, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার কারণে মানুষের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে গড়ে ৪১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ৮২৪টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বায়ুদূষণও বড় উদ্বেগের কারণ। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বস্তুকণাজনিত বায়ুদূষণের সঙ্গে প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার মানুষের মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের ঘাটতি
কেএইচআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে দেশের মোট চলতি স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ পরিবারকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের মাত্র ২৪ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে। জনগণকে সুরক্ষা দিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
১৬ জেলায় বিশেষ পদক্ষেপের সুপারিশ
জলবায়ু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ১৬টি জেলায় কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করেছে কেএইচআই। ২০২৭ সালের গরমের মৌসুমের আগেই জাতীয় তাপ ও স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রস্তুতি বাড়ানো এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য বিশ্রাম, পানীয় জল ও ছায়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ডেঙ্গুর আগাম সতর্কতা, বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণ উপকরণ ও খাবার স্যালাইন মজুত, স্বাস্থ্য খাতে পৃথক জলবায়ু বরাদ্দ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং জলবায়ু ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণা সংস্থাটির মতে, তাপপ্রবাহ মোকাবিলা, রোগের আগাম সতর্কতা, স্বাস্থ্যসেবায় অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন জরুরি। এসব পদক্ষেপ নেওয়া না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের অসুস্থতা, মৃত্যু ও কর্মক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়তে পারে।






