ফারুক আহমাদ আরিফ, রাজশাহী থেকে ফিরে: বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোরের মৃত ও পতিত জমিগুলোতে এখন সবুজের সমারোহ।  মাঠে মাঠে কাঁচা-পাকা ধান দুলছে। ধানের এই দোলা উদ্বেলিত করছে কৃষকের মনকে। ধানের পাশাপাশি টমেটো, আলু, ফুলকপি, বাধাকপি, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন ফসলেও এসেছে ভিন্নতা। আগে এসব জমিতে  শুধু বৃষ্টির পানিতে আমন ধান ও শীতকালীন সবজির চাষ হতো। 

এখন আউশ, আমন ও বোরোসহ তিনবার ধানের ফলন হচ্ছে সঙ্গে আবাদ হচ্ছে  সবজিও। সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার পাম্প স্থাপন বদলে দিয়েছে এই কৃষিকে। এরকম একজন উপকারভোগী কৃষক রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার  আনারুল। জানান, আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দিতে ব্যয় বেড়ে যেত। নওগাঁর পল্লী বিদ্যুতের লাইন কাছাকাছি থাকলেও তারা বিদ্যুৎ দিচ্ছিল না। যদিও লাইন করার সময় বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল।

আনারুল বলেন, আমরা সেচের জন্য ডিজেল দিয়ে দূরের পুকুর থেকে পাইপে পানি আনতাম। এখন সেই সমস্যা নেই। আকাশে রোদ থাকলে কল ভরে পানি উঠে। সেই পানি দিয়ে  ২০ জন কৃষকের ৩০-৩৫ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া যায়।

অন্য কৃষক সুমন বলেন, আগে এ অঞ্চলে শুধু বৃষ্টির পানিতে আমন ধান আবাদ হতো। আর শীতকালীন সবজি ও ডাল জাতীয় ফসল উৎপাদিত হতো। এখন আমনের পাশাপাশি বোরো ও আউশ ধানের আবাদ হচ্ছে। আগাম ফসল হিসেবে অনেকে ফুলকপি, বাধাকপি, টমেটোও করছে। 

সৌর পাম্পের পাশের একটি ক্ষেতে  পাকা ধান কাটছিলেন ৪ কৃষক ফয়েজ উদ্দীন, জাহাঙ্গীর হোসেন ও খয়ের উদ্দীন । এদের মধ্যে ফয়েজ উদ্দীন বলেন, আগে পানি না পেয়ে কৃষকরা ধান আবাদ করতে পারত না। এখন সৌর বিদ্যুৎ হওয়ায় পানির সংকট কেটে গেছে।  

সৌর বিদ্যুতের প্যানেলের পাশের জমিতে আক্তার হোসেন নামের একজন কৃষক তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষেত থেকে বেগুন তুলছিলেন। বললেন, এখন বেগুন, করলাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেছি। পাশের আরেকটি ক্ষেতে তিনি নিজস্ব খরচে পলিমালচিং  পদ্ধতিতে ফুলকপির চারা উৎপাদ করছেন । আক্তার হোসেন বলেন,  পানি পেয়ে মৃত ও পতিত জমিগুলো আমাদের জন্য আশির্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের  রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এরকম প্রায় ৩২টি সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল কৃষকদের সরবরাহ করা হয়েছে। যা কৃষকদের ফসলের নিবিড়তা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, সেচ ব্যয় কমানো এবং পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বরেন্দ্র অঞ্চলে সৌরশক্তিচালিত সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।  প্রকল্পের মাধ্যমে  বিনামূল্যে কৃষকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ৩টি ক্যাটাগরিতে সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থা নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ফিক্সড সোলার ইরিগেশন (২ অশ্বশক্তি): ২৪টি (নির্দিষ্ট জমিতে নিয়মিত সেচের জন্য)। পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন: ৮টি (সহজেই স্থানান্তরযোগ্য, ভিন্ন ভিন্ন প্লট বা বাগানে দ্রুত সেচের জন্য)। প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন: ১০টি (এক একর আয়তনের ফলবাগানের জন্য)। এর ফলে জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগ বা ডিজেলের ওপর নির্ভর না করেই প্রান্তিক কৃষকরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে পারছেন। বিদ্যুৎবিহীন প্রত্যন্ত এলাকাতেও এটি সহজে পরিচালনা করা যাচ্ছে।

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মতিউর রহমান  বলেন, সৌর প্যানেলের কারণে মাঠপর্যায়ে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছে। সহযোগিতা বাড়াতে পারলে সৌরবিদ্যুতের অতিরিক্ত অংশটুকু জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে।

এ ব্যাপারে এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট ফর রাজশাহী ডিভিশনের প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ এস.এম হাসানুজ্জামান বলেন, বিগত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ বা ডিজেলের ওপর নির্ভর না করে সূর্যের আলোকে ব্যবহার করে নিরবচ্ছিন্ন সেচ দিতে পারছে কৃষকরা। এর ফলে একদিকে জাতীয় বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করছে, অন্যদিকে কৃষকদের সেচ খরচ প্রায় শূন্যের নামিয়ে এনেছে। তিনি বলেন, খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোর সেচ এলাকা হ্রাস পাচ্ছিল।  সোলার পাম্পের কারণে  এখন অনাবাদী ও পতিত চাষের আওতায় আসায় ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। 

এই প্রকল্প পরিচালক জানান, ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে পাম্পগুলো ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত টেকসই হবে।  আগামীতে নতুন সোলার পাম্প স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান চালু থাকা ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলোকে সোলার সিস্টেমে রূপান্তরের জন্য একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

বরেন্দ্র এই অঞ্চলে ডিপ টিউবল প্রথমে যে কমান্ড এরিয়া নিয়ে যাত্রা করে, পরে ধীরে তা কমে আসে। যেমন, ১৫০ বিঘা জমি  নিয়ে শুরু করা পাম্পের চাষ করার ক্ষমতা করলো দুই বছর পর ১০০ বা ৮০ বিঘায় নেমে আসে।   আর সরকারও চাচ্ছে সোলারের পরিমাণ বাড়াতে।  ডিজেল চালিত পাম্পগুলোর সেটে সোলার পাম্প স্থাপন করলে  সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সেচ দেওয়া যায়।  সূর্যের আলো কম থাকলে পানিও কম উঠে। তবে প্রতিদিন যেহেতু সেচ দেওয়া হয় তাই চাহিদা পূরণ হয়ে যায়।

এসব সোলার পাম্প করতে টেন্ডার ভ্যালুতে ব্যয় হয়েছে ৫ লাখ টাকা। এখানে ৬টি প্যানেল আছে, প্রত্যেকটি ৫৫০ ওয়াট করে ৩২০০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ২ ঘোড়া শক্তি সম্পন্ন এসব পাম্প দিয়ে দৈনিক  ২০-২৫ বিঘায় সেচ দেওয়া যায়।