ফারুক আহমাদ আরিফ: সম্প্রতি পাতলা পায়খানা ও লাম্পি স্কিন ডিজিজে (এলএসডি) শরীয়তপুরের ডামুড্যা থানার পূর্ব ডামুড্যার মনির হোসেনের একটি ৬ মাস বয়সী গরুর বাছুর মারা গেছে। পশুটির চিকিৎসা করেছিলেন লুৎফর রহমান নামের একজন গ্রাম্য পশু চিকিৎসক। তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর যাবত গ্রামে গবাদি পশু যেমন গরু, ছাগল, মহিষ, ঘোড়া ও পাখিদের মধ্যে হাঁস-মুরগি এবং কবুতরের চিকিৎসা করে আসছেন। লুৎফর রহমান বলেন, মনির হোসেনের গরুর বাছুরটির এলএসডি ও পাতলা পায়খানা হয়েছিল। এলএসডিতে আক্রান্ত হলে ভ্যাক্সিন দিতে হয়। পাশাপাশি পাতলা পায়খানার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছিল তা কাজ করেনি।
তিনি বলেন, ভাইরাসের ক্ষেত্রে অনেক অ্যান্টিবায়োটিক গবাদি পশু ও পাখির দেহে কাজ করছে না। বিশেষ করে যেসব প্রাণীর এলএসডি, ম্যাস্টাইটিস বা ওলান প্রদাহ, ভাইরাস জ্বর ইত্যাদি। তা ছাড়া কৃষকদের যেসব গরু-ছাগল মাঠে চড়ানো হয় সেসব পশু এসএমডি, চরকা, লিভার ফ্লু, নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত বেশি হচ্ছে। এসব রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে মাত্রারিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের ভাষায় এএমআর হলো- এমন একটি অবস্থা, যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক এবং পরজীবীর মতো জীবাণুগুলো অ্যান্টিবায়োটিক বা জীবাণুনাশক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে এবং ওষুধগুলো আর কার্যকর থাকে না।
এ ব্যাপারে ডামুড্যা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মানসুরুল হক বলেন, ‘যখন সাধারণ ওষুধে কাজ হয় না, তখন বাধ্য হয়ে উচ্চমাত্রার বা দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়। এর ফলে এই ওষুধের অবশিষ্টাংশ প্রাণিদেহে ও পরিবেশে রয়ে যায়, যা খুবই ক্ষতিকর। রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধের অকার্যকারিতার এই বিষয়টি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।’
গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র
চিকিৎসকদের ভাষায়, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের মতো জীবাণুগুলো যখন ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলে এবং ওষুধ তাদের আর ধ্বংস করতে পারে না, তখন সেই অবস্থাকে এএমআর বলা হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজি সেলের উপপরিচালক ডা. মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করলেও তা অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৪-২৫ সালে চারটি জেলার ৭২টি ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালি মুরগির খামারের ওপর অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দেখা যায়, ই-কোলাই, সালমোনেলা, এন্টারোকক্কাস ও ক্যাম্পাইলোব্যাকটরের মতো ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ই- কোলাই ব্যাকটেরিয়াটি ১৯টি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেছে।
চলতি বছর মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করা ব্রয়লার মুরগির মাংস ও ডিমের ১৩৯টি নমুনা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, মাংসের নমুনায় দুটি অ্যান্টিবায়োটিকের (অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ও এনরোফ্লক্সাসিন) উপস্থিতি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। তবে পরীক্ষাকৃত ডিমে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ব্রয়লার, লেয়ার, গরু, ছাগল ও ভেড়া থেকে পাওয়া জীবাণুর মধ্যে ৭১ শতাংশই একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী।
এদিকে চলতি বছরের ৩ জুন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই গবাদিপশু পালনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সরকারগুলো ব্যবস্থা না নিলে আগামী ১৫ বছরে গবাদিপশুর খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাড়বে। তাতে করে মানবদেহে অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের কার্যকারিতায় ভয়াবহ প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। ২০৪০ সালের মধ্যে প্রতিবছর গবাদিপশুকে এক লাখ ৪৩ হাজার টনের বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রয়োগ করা হবে। তাতে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০৪০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ২০৪০ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গবাদি পশুর ক্ষেত্রে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহার বিশ্বের শীর্ষস্থান বা ৬৫ শতাংশ হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, খামারিরা গবাদি পশু মোটাতাজা করতে এক ধরনের দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক বেশি ব্যবহারে ওষুধের প্রতি জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা (রেজিস্ট্যান্স) বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। তাতে করে ২০৪০ সালের মধ্যে গবাদিপশু খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। অথচ অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করলে খরচ হবে ৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজি সেলের উপ-পরিচালক ডা. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রাণিদেহের অ্যান্টিবায়োটিক দুধ, মাংস ও ডিম খাওয়ার মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। এতে করে মানুষের দেহেও এএমআর তৈরি হবে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়।
যুক্তরাজ্যের সহায়তায় ২০২০ সাল থেকে ফ্লেমিং ফান্ড কান্ট্রি গ্রান্ট টু বাংলাদেশের আওতায় ওয়ান হেলথ পদ্ধতির মাধ্যমে এএমআর নজরদারি শক্তিশালী করতে সহায়তা করে আসছে। প্রকল্পটি চলতি বছরের মার্চে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটির টেকনিক্যাল লিড ড. মো. নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে কীভাবে এএমআর বুঝা যায় সেই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং করেছি। হিউম্যান হেলথের জন্য ডিজি হেলথ আন্ডারে অনেকগুলো ল্যাব করে দিয়েছি, এনিমেল হেলথের জন্য লাইভস্টক ও মাছের জন্য মৎস অধিদপ্তরসহ ২০টি ল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছি। যেখানে ল্যাব গবেষণার মাধ্যমে এন্টিমাইক্রোবিল রেজিস্ট্যান্সের নজরদারী করা যায়।
তিনি বলেন, বিভিন্ন স্যাম্পল টেস্ট করার জন্য ল্যাব কেমিক্যালের ব্যবস্থা করেছি। ডাক্তার, বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এখন অনেকগুলো অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। এর কারণ অ্যান্টিবায়োটিকের অযথা ও অপ্রয়োজনে বেশি ব্যবহার। কোর্স অসমাপ্ত রাখা। দেশে ড্রাগ এন্ড কসমেটিক অ্যাক্টে রেজিস্ট্রারভুক্ত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করলে দোকানদারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। এটি বাস্তবায়ন করলে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অনেক কমে আসবে।
গবাদি পশু এবং হাঁস-মুরগির দেহে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন বলেন, গবাদি পশুকে নিষিদ্ধ ওষুধ সেবন করানোর ফলে তাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। মানুষ যখন এই সংক্রামিত মাংস বাজার থেকে কিনে আনে, তখন অসতর্কভাবে কাটাকাটি বা সঠিক তাপে রান্না না করার কারণে সেই প্রতিরোধী জীবাণু মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। মূলত অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ পশুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে এই শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এভাবে প্রাণিজ সম্পদ থেকে উদ্ভূত এএমআর সরাসরি মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।






