কৃষি খবর ডেস্ক: ফসল রক্ষায় কীটনাশক কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ। তবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি, ভুল মাত্রায় কিংবা ভুল সময়ে এর ব্যবহার তৈরি করছে নতুন ঝুঁকি। এতে শুধু কৃষকের উৎপাদন খরচই বাড়ছে না, প্রভাব পড়তে পারে মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর।
পোকামাকড়, রোগবালাই ও আগাছা নিয়ন্ত্রণে অনুমোদিত বালাইনাশক সঠিক নিয়মে ব্যবহার করলে ফসল রক্ষায় তা কার্যকর হতে পারে। কিন্তু রোগ বা পোকার ধরন না জেনে ওষুধ প্রয়োগ, একসঙ্গে একাধিক কীটনাশক ব্যবহার কিংবা নির্ধারিত মাত্রা না মানার মতো ঘটনা কৃষিতে উদ্বেগ তৈরি করছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা—এফএওর তথ্য অনুযায়ী, কীটনাশকের ব্যবহার মাটি ও পানিতে দূষণ তৈরি করতে পারে এবং ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে লক্ষ্যবহির্ভূত জীব ও জীববৈচিত্র্যকে। এ কারণে বিশ্বজুড়েই কীটনাশকের ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশেও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
বঙ্গভবনে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি বলেন, অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে আসছে, সমস্যাটি শুধু কৃষকের কীটনাশক ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়। রোগ-পোকা শনাক্তকরণে দুর্বলতা, পর্যাপ্ত কারিগরি পরামর্শের অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে বিক্রেতার পরামর্শের ওপর নির্ভরতার কারণেও অপ্রয়োজনীয় বালাইনাশক ব্যবহার হতে পারে।
তাই কীটনাশক ব্যবস্থাপনায় কৃষকের পাশাপাশি ডিলার, খুচরা বিক্রেতা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এক্ষেত্রে ডিলারদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও লাইসেন্সধারী বিক্রেতার মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো গেলে অনুমোদিত পণ্য, মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
কীটনাশক বিক্রির লাইসেন্স ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে PRISM প্ল্যাটফর্মে বালাইনাশক লাইসেন্সিং অটোমেশন চালু করা হয়েছে এবং ম্যানুয়াল লাইসেন্স প্রদান বন্ধের কথা জানানো হয়েছে।
কৃষকদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণে রোগ ও পোকা শনাক্তকরণ, কখন কীটনাশক প্রয়োজন, সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা, ফসল কাটার আগে অপেক্ষাকাল এবং খালি প্যাকেট নিরাপদে ফেলার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কীটনাশকের ঝুঁকি কমাতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএমকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রথমেই রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রয়োজন অনুযায়ী জৈবিক, যান্ত্রিক ও অন্যান্য অরাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করা এবং একান্ত প্রয়োজন হলে অনুমোদিত বালাইনাশক প্রয়োগ করা।
কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কীটনাশক মেশানো ও স্প্রে করার সময় গ্লাভস, মাস্ক, সুরক্ষা পোশাক ও চোখের সুরক্ষা ব্যবহার এবং লেবেলের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে কোনো নির্দিষ্ট রোগ বা ক্যানসারের জন্য বাংলাদেশের কৃষকদের ক্ষেত্রে এককভাবে কীটনাশককে দায়ী করার আগে স্থানীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যতথ্য প্রয়োজন। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও স্থানীয় তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
মাটির ওপরও এর প্রভাব রয়েছে। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, কিছু কীটনাশক মাটির অণুজীব, কেঁচোসহ বিভিন্ন মাটিজীবের ওপর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং মাটির জীববৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা কীটনাশকের খালি বোতল ও প্যাকেট। এগুলো যত্রতত্র ফেলে দিলে অবশিষ্ট রাসায়নিক মাটি ও পানিতে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশে এ সমস্যা মোকাবিলায় ইতোমধ্যে একটি উদ্যোগের অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এফএওর উদ্যোগে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় খালি কীটনাশক প্যাকেজিং সংগ্রহ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার পাইলট কর্মসূচি চালানো হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে কর্মসূচি শেষে সেখানে ১ দশমিক ৩৬ টন কীটনাশক প্যাকেজিং বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।
এদিকে বাংলাদেশে নতুন কীটনাশক নীতি তৈরির উদ্যোগও আলোচনায় রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় নতুন নীতি প্রণয়নে ১৯ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় কীটনাশকের ব্যবহার, আমদানি, নিবন্ধন, গুণগত মান ও নিরাপদ প্রয়োগকে একসঙ্গে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বিষয় নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পণ্য, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় ও সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহারই মূল বিষয়।
কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য, কৃষকের স্বাস্থ্য, মাটির উর্বরতা ও পরিবেশ রক্ষা করতে হলে কীটনাশক ব্যবস্থাপনাকে মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।






