ড. নুর খোন্দকার: শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) ১৯৩৭ সালে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের জন্য একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, পরিবেশ ও আবাসিক ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মাঠ, পরীক্ষণ প্লট, সবুজ এলাকা, উন্মুক্ত স্থান ও আবাসিক সুবিধা কোনো অতিরিক্ত সম্পদ নয়; এগুলো শিক্ষা ও গবেষণার অপরিহার্য অংশ।
সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব
১. শিক্ষা ও গবেষণা: কৃষিজমি ও গবেষণার মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সূর্যালোক, ছায়া ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনে ফসল উৎপাদন, ব্যবহারিক শিক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ব্যাহত হতে পারে।
২. পরিবেশ: ধুলাবালি, শব্দ, বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা ও জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। সবুজ এলাকা ও পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৩. আবাসিক পরিবেশ: শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের স্বাস্থ্য, স্বাভাবিক জীবনযাপন, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৪. নগর অবকাঠামো: যানজট, পার্কিং, পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
৫. ভবিষ্যৎ উন্নয়ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার ও আবাসন সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হতে পারে। কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর স্বতন্ত্র পরিচয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কেন জরুরি?
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের Development Project Proforma (DPP) নির্দেশিকা—Green Book 2022-এর অনুচ্ছেদ ১.১.২ অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক। এ সমীক্ষার ফলাফল ও সুপারিশ প্রকল্প দলিলে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। প্রস্তাবিত সচিবালয় প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সমীক্ষা সম্পন্ন হয়ে থাকলে তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য প্রকাশ করতে হবে। সমীক্ষা সম্পন্ন না হয়ে থাকলে নির্মাণকাজের অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সমীক্ষা পরিচালনা করা জরুরি।
সমীক্ষায় যেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, কৃষিজমি ও আবাসিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব। পরিবেশ, বায়ুপ্রবাহ, সূর্যালোক, শব্দ, তাপমাত্রা ও পানি নিষ্কাশনের অবস্থা। যানজট, সড়ক, পানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ওপর চাপ। প্রস্তাবিত স্থানের উপযুক্ততা এবং সচিবালয় নির্মাণের বিকল্প স্থানসমূহের তুলনামূলক মূল্যায়ন। প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব।
সমীক্ষাটি প্রকল্পের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত নেই—এমন একটি অভিজ্ঞ ও স্বাধীন বহুবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের দাবি ও সুপারিশ
১. প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন ও কারিগরি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
২. Green Book 2022-এর নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
৩. প্রয়োজনীয় সমীক্ষা সম্পন্ন না হয়ে থাকলে নির্মাণকাজের আগে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে।
৪. বর্তমান স্থানের পাশাপাশি সচিবালয় নির্মাণের বিকল্প স্থানগুলোও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
৫. শেকৃবির শিক্ষা, গবেষণা, পরিবেশ, আবাসন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ওপর পৃথক প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে।
৬. বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
৭. বর্তমান স্থানকে উপযুক্ত বিবেচনা করা হলে ভবনের উচ্চতা, অবস্থান, সবুজ বেষ্টনী, পানি নিষ্কাশন ও অন্যান্য ক্ষতি প্রশমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এর গবেষণার মাঠ, সবুজ পরিবেশ, উন্মুক্ত স্থান ও আবাসিক সুবিধা রক্ষা করা জাতীয় স্বার্থেই প্রয়োজন। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই; তবে উন্নয়ন হতে হবে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও জনস্বার্থসম্মত। তাই শুধু আশ্বাস নয়, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও কারিগরি ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রকাশ করতে হবে। অতএব, স্বাধীন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিকল্প স্থান মূল্যায়ন এবং শেকৃবির ওপর সার্বিক প্রভাব বিশ্লেষণ সম্পন্ন ও প্রকাশ না করা পর্যন্ত কোনো অপরিবর্তনীয় নির্মাণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার জন্য জোরালো দাবি জানাচ্ছি।
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়






