জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: খাদ্য নিরাপদ করা বড় একটি কাজ। শুধু বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একক কাজ দ্বারা এটি সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, খাদ্য উৎপাদনে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে আমাদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। কেননা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে সকলের সন্তান ও সব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) পরিদর্শন, নিয়ন্ত্রণ ও সমম্বয় কার্যক্রম জোরদারকরণে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) কারিগরি সহযোগিতায় বাস্তবায়িত প্রজেক্ট ফর স্ট্রেনথিং দ্য ইন্সপেকশন, রেগুলারিটি এন্ড কোঅর্ডিনেটিং ফাঙ্কশন অব দ্য বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (এসটিআইআরসি) প্রকল্পের ফাইনাল রেজাল্ট শেয়ারিং ওয়ার্কশপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় অনুষ্ঠানে বিএফএসএর চেয়ারম্যান (অতিক্রম সচিব) শফিকুল ইসলাম এসব কথা বলেন।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর শাহবাগে বিএফএসএর প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সচিব ও এসটিআইআরসি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (যুগ্মসচিব) শ্রাবস্তী রায়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কর্তৃপক্ষের সচিব শ্রাবস্তি রায়, বক্তব্য রাখেন জাইকা বাংলাদেশের সিনিয়র প্রতিনিধি ইজুমি শোজি, এসটিআইআরসির টিম লিডার আতসুশি কোয়ামা, প্রকল্পের কার্যক্রম তুলে ধরেন মিনা ইশিগাকি, বিএফএসএর সদস্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মো. শোয়েব, আ ন ম নাজিমুদ্দিন, আনোয়ারুল ইসলাম।

মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকারের কাজ ছিল মানুষের খাবার নিশ্চিত করা, যাতে খাবারের অভাবে মানুষের মৃত্যু না হয়। এজন্য কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ সকল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। আর তাতে সফলতাও অর্জিত হয়েছে। এখন আমাদের উদর ভর্তি হচ্ছে কিন্তু এখন দেখার বিষয় খাবারটি নিরাপদ কিনা। আমরা যেসব সবজি, দুধ, খাদ্যপণ্য বাজার থেকে কিনছি তা নিরাপদ কিনা।  

এর আগে বিএফএসএর চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, পহেলা নভেম্বর থেকে লাইসেন্স কার্যক্রম শুরু হয়েছে, এটি চলছে। এটি নভেম্বরই শুরু হয়েছে বিষয়টি তেমন নয়। এ কাজ করতে অনেক সময় দরকার। হয়তো ৫ বছরও লেগে যেতে পারে। খাদ্য উৎপাদনের জন্য ১৬টি ক্যাটারির জন্য রেজিষ্ট্রেশন ও ৪টি ক্যাটাগরির জন্য আলাদা করে লাইসেন্স নিতে হবে ও কিছু ফি দিতে হবে। 

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ফুটপাতের পুরি, পিয়াজু বিক্রেতাদের লাইসেন্স নিতে হবে, কিন্তু প্রকৃত কথা হচ্ছে তাদের লাইসেন্স নিতে হবে না। কেননা তাদের তো রেজিষ্ট্রেশন নেই। তবে তাদের তদারকি করা হবে। আগামীতে সরকার যদি হকারদের জন্য কোন সিদ্ধান্ত নেন তখন আলাদা করে চিন্তা করা হবে। 

তিনি বলেন, খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতে শৃঙ্খলায় আনতে রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রমের আওতায় আনা হচ্ছে। আর রেজিষ্ট্রেশনগুলো মূলত অনলাইনে করা হবে। ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা না বাড়লে সরকারের পক্ষে কাজ করা সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, প্রকল্পের অর্জনগুলো বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, খাদ্যশিল্প এবং জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের সর্বস্তরে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে এ উদ্যোগ অবদান রাখবে।

বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিদের সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে শোজি ইজুমি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু একটি কারিগরি বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, জনগণের আস্থা এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, ’জাইকা বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী। দীর্ঘদিন ধরে জাপান আমাদের অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে কাজ করে আসছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে, দক্ষতা উন্নয়নে ও সচেতনতা বৃদ্ধিকরণে জাইকার কারিগরি সহযোগিতায় বাস্তবায়িত স্টার্ক প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।  

 তিনি বলেন, প্রকল্পের অর্জনগুলো বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, খাদ্যশিল্প এবং জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের সর্বস্তরে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে এ উদ্যোগ অবদান রাখবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও পরিকল্পনা উইংয়ের পরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, যেকোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পরিচালক যথাযথভাবে কাজ করেছে। তিনি নিজে যা জানেন না বা বুঝতে পারেন না তা অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারিসহ ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন লোকদের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করেছেন। এতে কোন ধরনের কার্পণ্য করেনি। আর সকলেই তাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছে। তিনি বলেন, খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সার্টিফিকেট দরকার পড়ে। এতে করে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য  রপ্তানি বাড়বে। 

আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদক ও ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা ও দায়িত্ব হতে হবে। শুধু রেজিষ্ট্রেশন করলেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে না। তিনি বলেন, জাপান আগামীতে ৯টি বড় ধরনের ল্যাব তৈরি করবে দিবে। আমরা ইউরোপ বা জাপান নই বাংলাদেশ। আমাদের ১৮ কোটি মানুষ। রেজিষ্ট্রেশনে নিরাপদ খাদ্য মিলবে না। 

আ ন ম নাজিমুদ্দিন বলেন, আমাদের কার্যক্রমের বয়স ৮ বছর। এই অল্পসময়ে প্রতিষ্ঠানটি থেকে পরিপূর্ণ কার্যক্রম আশা করা যাবে না। তিনি বলেন, জেলায় জেলায় মিনি ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। আগামীতে এগুলো আরো সমৃদ্ধ করা হবে। 

আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়ায় জাইকাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সদস্য মো. শোয়েব বলেন, বিভাগ ও জেলা মিলে ৭২টি মিনি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। মাইক্রোবায়োলজি টেস্টের জন্য ল্যাবগুলো তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে বিএফএসএ এর কার্যক্রম নিয়ে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয় যা আমাদের কষ্ট দেয়। এক্ষেত্রে সকলের দায়িত্বশীল লেখা ও মন্তব্য আহ্বান করি। মো. শোয়েব বলেন, সপ্তাহে ৭ দিনই ২৪ ঘণ্টা আমরা নিরাপদতা নিয়ে কাজ করি।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ও নবাবী ভোজের মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী বিপু বলেন, আমি শুরু থেকে বিএফএসএর সঙ্গে প্রথমদিকে এসে চুক্তি করি। কেননা আমি বিশ্বাস করি কর্তৃপক্ষ কারো ক্ষতির জন্য নয় বরং মানুষের খাদ্য নিরাপদতার জন্য কাজ করছে। তিনি বলেন, জাইকা আমার নবাবী ভোজে প্রথমবার খাদ্যের মান পরীক্ষা চালিয়ে ১০০ নাম্বারের মধ্যে ৮৪ ও দ্বিতীয়বার ৯১ পেয়েছিলাম।

ইফাদ গ্রুপের কোয়ালিটি কন্ট্রোরেলের এজিএম বিদ্যুৎ কুমার পাউল বলেন, ল্যাব পরিবর্তন হলে অনেক সময় পরীক্ষার ফলাফল বদলে যায়। এটি যাতে না হয় সেজন্য ল্যাবগুলোর সক্ষমতা পরিপূর্ণভাবে ভালো হতে হবে।

প্রাণ গ্রুপের কোয়ালিটি কন্ট্রোলার মারুফ কবির বলেন, ল্যাবের ডাটা অথেনটিক হতে হবে। এজন্য ল্যাব মিনি হয় না। আমাদের কাজটি কমপ্লিট ও অথেনটিক হতে হতে হবে।

শ্রাবস্তি রায় বলেন, জাইকার অর্থায়নে ২০২৭ সালের মার্চ থেকে আমাদের আরেকটি প্রকল্প শুরু হবে। সেখানে জাইকা অনুদান হিসেবে অর্থায়ন করেছে। দেশের ৬৪ জেলায় মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে ইসমাঈল জবিহুল্লাহ আহ্বান জানিয়েছে। 

বগুড়ার নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. রাসেল বলেন, বগুড়ায় প্রথম পর্যায়ের যন্ত্রপাতিগুলো ভালো ছিল। তিনি বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের পেশাগত দক্ষতা বেড়েছে। মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবগুলো ভাড়া ভবনে পরিচালনা করায় বেশকিছু সমস্যা হচ্ছে। তিনি নিজস্ব ভবনে ল্যাব স্থাপনের আহ্বান জানান।

জবাবে উপস্থাপক মো. মাসুদ আলম বলেন, আমাদের কিছু যন্ত্রপাতি অন্যান্য স্থান থেকে আমদানি করা হয়েছে। তাতে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। আগামীতে কেনাকাটায় আরও যত্নশীল হবো। 

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জাইকার কারিগরি সহযোগিতার অংশ হিসেবে এসটিআইআরসি প্রকল্পটি দেশের নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা উন্নয়নে কাজ করেছে। প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল নিরাপদ খাদ্য-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমের উন্নয়ন, খাদ্য পরিদর্শন ও নমুনা সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার, পরীক্ষাগারের কার্যক্রমের উন্নয়ন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা করা।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৮টি জেলায় নিরাপদ খাদ্য কার্যালয়ে মিনি-ল্যাবরেটরি স্থাপনে সহায়তা  করা হয়েছে। পাশাপাশি ৬০টি জেলা কার্যালয় ও ৮টি মহানগর কার্যালয়ের পরীক্ষাগার কার্যক্রম পরিচালনায় কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষা নমুনা বিশ্লেষণ এবং খাদ্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঝুঁকি শনাক্তকরণের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এছাড়া নিরাপদ খাদ্য আইন, বিধিমালা, মানদণ্ড ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তাদের পরিদর্শন কার্যক্রম, নমুনা সংগ্রহকারীদের নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষাগার সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পরীক্ষণ দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রকল্পটি বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থাবিধিবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষার্থী ও ক্যান্টিন কর্মীদের প্রশিক্ষণ, মিষ্টি প্রস্তুতকারীদের জন্য প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বেকারি সংশ্লিষ্ট কর্মী ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি জিএমপি ও জাপানিজ ৫এস কাইজেন পদ্ধতিবিষয়ক প্রশিক্ষণ ভিডিও, খাদ্য ব্যবসায়ীদের জন্য প্রশিক্ষণ সহায়িকা, খাদ্য স্থাপনা পরিদর্শন চেকলিস্ট ও গাইডলাইন এবং ডিজিটাল মার্কেটিং কৌশলের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।