কৃষি খবর ডেস্ক: ব্রিটেনের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ক্লার্কসনস ফার্ম’ দেখে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হচ্ছে দেশটির তরুণ প্রজন্ম। অনুষ্ঠানটি কৃষির গুরুত্ব, খাদ্য উৎপাদনে কৃষকদের ভূমিকা এবং এ খাতের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরায় তরুণদের মধ্যে কৃষি নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ল্যাঙ্কাশায়ারের ১৭ বছর বয়সী এলি তাদেরই একজন। তাঁর দাদা-দাদি গার্সট্যাংয়ের কাছে একটি দুগ্ধ খামার পরিচালনা করেন। তাঁদের বাড়িতেও ভেড়া ও গরু পালন করা হয়। কৃষির সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও শুরুতে এলি এ-লেভেল পড়াশোনা করে অন্য পেশায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু জেরেমি ক্লার্কসনের অনুষ্ঠানটি দেখার পর তাঁর সিদ্ধান্ত বদলে যায়। তিনি কলেজে কৃষিবিষয়ক পড়াশোনা শুরু করেন।

বিবিসি নর্থ ওয়েস্ট টুনাইটকে এলি বলেন, “আমি এক বছর এ-লেভেল পড়েছিলাম, কিন্তু সেটি আমার জন্য উপযুক্ত মনে হয়নি। তাই কৃষিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। জেরেমি ক্লার্কসন পুরো দেশের মানুষের সামনে কৃষিকে তুলে ধরেছেন। খাদ্য উৎপাদনে ব্রিটেনে কৃষি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি দেখিয়েছেন। এখন অনেক মানুষই কৃষিতে আসতে চায়।”

এলির মতো কৃষিতে আগ্রহী তরুণের সংখ্যা বাড়ছে। মায়ার্সকফ কলেজ জানিয়েছে, তাদের কৃষিবিষয়ক কোর্সগুলোতে ভর্তির আবেদন প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই প্রবণতার পেছনে ‘ক্লার্কসনস ফার্ম’-এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।

কৃষির সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক না থাকা শিক্ষার্থীরাও অনুষ্ঠানটি দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। এমনই একজন ১৭ বছর বয়সী অলিভার। তাঁর মতে, ডিডলি স্কোয়াট খামারের নানা উত্থান-পতন দেখে তাঁর অনেক সহপাঠী কৃষিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার আগ্রহ পেয়েছেন।

অলিভার বলেন, “জেরেমি ক্লার্কসন অনেক বড় প্রভাব তৈরি করেছেন। তিনি নিজেও কৃষক পরিবারের সন্তান নন। অনুষ্ঠানটি কৃষির এমন একটি দিক তুলে ধরেছে, যা অনেক মানুষ আগে দেখেনি। এর মধ্যে কৃষিকাজের কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “এটি একটি জীবনধারা। শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, এই জীবনযাপনের জন্যই মানুষ কৃষিতে আসে।”

মায়ার্সকফ কলেজের কোর্স শিক্ষক ডেভিড সিঙ্গেলটন জানান, ‘ক্লার্কসনস ফার্ম’ প্রথম প্রচারের পর থেকেই কৃষিবিষয়ক কোর্সে ভর্তির আবেদন বাড়তে শুরু করে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ায় কলেজে শিক্ষক ও কর্মীর সংখ্যাও বাড়াতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীর সংখ্যায় অনুষ্ঠানটির বেশ বড় প্রভাব পড়েছে। আমরা দেখছি, কৃষি খাতের বাইরের অনেক মানুষও ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে কৃষিতে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অনুষ্ঠানটি প্রচার শুরুর পর থেকে আমাদের আবেদন প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।”

সিঙ্গেলটনের মতে, আইটিভির ‘ফ্লেচারস ফ্যামিলি ফার্ম’ অনুষ্ঠানটিও তরুণদের কৃষির প্রতি আগ্রহী করতে ভূমিকা রেখেছে। এতে সাবেক ‘এমারডেল’ অভিনেতা কেলভিন ফ্লেচারকে দেখা যায়।

তবে ‘ক্লার্কসনস ফার্ম’ কৃষিজীবনের বাস্তব চিত্র কতটা নির্ভুলভাবে তুলে ধরেছে, তা নিয়ে কিছু কৃষক প্রশ্ন তুলেছেন। তারপরও কৃষকদের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ, চাপ ও কঠিন পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্য অনুষ্ঠানটি প্রশংসিত হয়েছে।

বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৃষিতে আগ্রহ তৈরিতে কৃষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ হ্যারিয়েট কোয়ানের প্রভাব রয়েছে। অনুষ্ঠানের চতুর্থ মৌসুমে তিনি জেরেমি ক্লার্কসনের খামারে কাজ করেন। মায়ার্সকফ কলেজের শিক্ষার্থীরা তাঁকে নিজেদের অনুপ্রেরণার একজন হিসেবে দেখছেন।

বেকাপ এলাকায় কৃষি খামার পরিচালনাকারী পরিবারের মেয়ে মেলিনা বলেন, “তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেখানে কাজ করেছেন। সাজসজ্জা ও নখের পরিচর্যা বজায় রেখেও তিনি কৃষিকাজ করেছেন। এর মাধ্যমে প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন।”

নারীদের কৃষিকাজের দক্ষতা নিয়েও কথা বলেন শিক্ষক সিঙ্গেলটন। তাঁর মতে, অনেক কাজে মেয়েরা ছেলেদের চেয়েও ভালো করছেন। বিশেষ করে গবাদিপশুর পরিচর্যায় তাঁদের মনোযোগ ও খুঁটিনাটি বিষয়ে নজর বেশি থাকে। যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শিখে নিলে তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন এবং যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম থাকে।

কৃষক হওয়ার সিদ্ধান্ত কনি নামের আরেক শিক্ষার্থীর কাছে ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। কৃষিকাজের নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে খামারে কাজ করার স্মৃতি তাঁকে এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।

কনি বলেন, “আমার যতটুকু মনে পড়ে, বাবার সঙ্গে বাইরে গিয়ে কাজ করেই বড় হয়েছি। কৃষক হওয়া ছাড়া ভবিষ্যৎকে অন্যভাবে কখনো কল্পনা করতে পারিনি।”