কৃষি খবর ডেস্ক: ফ্রান্সে শামোন্ডা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম মানব রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর পর থেকে গবাদিপশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের মানবস্বাস্থ্য ও প্রাণীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক দশক আগে নাইজেরিয়ায় শনাক্ত হওয়া ভাইরাসটি চলতি বছর প্রথমবারের মতো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শামোন্ডা ভাইরাস মূলত গবাদিপশুকে আক্রান্ত করে। তবে সম্প্রতি মানুষের শরীরে সংক্রমণের ঘটনা ভাইরাসটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শামোন্ডা ভাইরাস কী?
শামোন্ডা ভাইরাস মূলত সংক্রমিত মিজ বা অতি ক্ষুদ্র রক্তচোষা উড়ন্ত পোকামাকড়ের কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি প্রধানত গরুকে আক্রান্ত করে। তবে ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া ও আলপাকার মতো প্রাণীর মধ্যেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
ভাইরাসটি একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যে গোষ্ঠীতে স্মালেনবার্গ ভাইরাস রয়েছে। স্মালেনবার্গ ভাইরাস গবাদিপশুর প্রজননজনিত সমস্যা, গর্ভপাত এবং ভ্রূণের গুরুতর জন্মগত ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে।
কোন কোন দেশে ছড়িয়েছে শামোন্ডা ভাইরাস?
১৯৬৫ সালে নাইজেরিয়ায় গরুর শরীরে প্রথম শামোন্ডা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। এরপর আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রথমবারের মতো ইউরোপে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হয়। ২০ অক্টোবরের মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের এক ডজনেরও বেশি দেশে ভাইরাসটির সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়।
ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষের ধারণা, দেশটিতে বসন্তকাল থেকেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছিল।
প্রাণীদের জন্য কতটা বিপজ্জনক?
শামোন্ডা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রাণীর শরীরে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে— জ্বর ও ডায়রিয়া। দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া। গর্ভপাত।
বিশেষ করে গর্ভবতী গবাদিপশুর ক্ষেত্রে ভাইরাসটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। সংক্রমণের ফলে প্রজনন ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে খামারিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
তবে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের ধরনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ)।
মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকি রয়েছে?
ফ্রান্সে শনাক্ত হওয়া প্রথম মানব রোগী লিওঁর একটি হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল ছিল। পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের ধারণা, পূর্ব ফ্রান্সে সংক্রমিত মিজের কামড়ের মাধ্যমে ওই ব্যক্তি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। ওই অঞ্চলে চলতি বছরের শুরুতে গবাদিপশুর মধ্যে ভাইরাসটির বিস্তার ঘটেছিল।
রোগীর মস্তিষ্কে দেখা দেওয়া জটিলতার সঙ্গে শামোন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণের সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা প্রবল বলে জানিয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। তবে সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বর্তমানে পাওয়া তথ্য এবং একই ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে বিদ্যমান জ্ঞানের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে এর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও কম।
তবে একজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা থেকে ভাইরাসটি সাধারণ মানুষের জন্য কতটা বিপজ্জনক, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিশেষ করে রোগীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল থাকায় সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি একই রকম কি না, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ভাইরাসটির বিস্তার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য কম কেন?
শামোন্ডা ভাইরাস বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাভুক্ত রোগ নয়। ফলে সংস্থাটির নির্দিষ্ট রোগভিত্তিক বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন ব্যবস্থার আওতায় দেশগুলোকে এর সংক্রমণের তথ্য জানাতে হয় না।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাণিস্বাস্থ্য আইনেও ভাইরাসটি তালিকাভুক্ত নয়। তাই এর জন্য আলাদা করে বাধ্যতামূলক নজরদারি চালানোর নিয়ম নেই।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটির প্রকৃত বিস্তার, সংক্রমণের সংখ্যা এবং প্রাণিসম্পদের ওপর সামগ্রিক প্রভাব সম্পর্কে পাওয়া তথ্য অসম্পূর্ণ হতে পারে।
সামনে কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন?
শামোন্ডা ভাইরাসের বিস্তার ও মানবস্বাস্থ্যে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ জরুরি। বিশেষ করে গবাদিপশুর মধ্যে সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ, রোগাক্রান্ত প্রাণীর উপসর্গ শনাক্ত করা এবং মিজের কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হলে দ্রুত তদন্ত ও পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাসটির প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সূত্র: রয়টার্স





