কৃষি খবর ডেস্ক: কানাডা থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট কিছু কৃষি ও বনজ পণ্যের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্বাক্ষরিত এই নির্দেশের ফলে কানাডার সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্য মেইনের কৃষক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারে। তবে শুল্কছাড় কার্যকর হবে আগামী ৩০ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে।

কানাডার পণ্যে ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক আরোপের কারণে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কানাডা থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছে।

কোন কোন পণ্যে শুল্কছাড়?

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন নির্দেশনায় নির্দিষ্ট কিছু কাঠের পাত, কাগজজাত পণ্য, যন্ত্রপাতি, শীতলীকরণ সরঞ্জাম, পণ্য পরিবহনের বাক্স ও কাঠের প্যাকিং বাক্সকে শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া তাজা ও শুকনো সামুদ্রিক শৈবালও শুল্কছাড়ের তালিকায় রয়েছে।

তবে শুল্কছাড়ের প্রভাব সামঞ্জস্য করতে কানাডার আরও কয়েকটি পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের তালিকা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নতুন তালিকায় রয়েছে কার্পেট, রং, বর্জ্য, শ্যাম্পু, কোকো পাউডার, কাঠের কফিন, আইসক্রিমের কাঠি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ডিপ ফ্রিজ, তিরন্দাজির সরঞ্জাম ও ডিঙি নৌকা।

ব্লুবেরি, আলু ও আপেলচাষিরা লাভবান হতে পারেন

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর সুসান কলিন্স বলেছেন, শুল্কছাড়ের ফলে মেইনের ব্লুবেরি, আলু, আপেল ও সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদকেরা উপকৃত হবেন। তাঁর মতে, এসব উৎপাদন রাজ্যটির অর্থনীতি এবং গ্রামীণ ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কলিন্সের ভাষ্য, মেইনের অনেক কৃষক ও উৎপাদক কানাডা থেকে বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং উপকরণ ও অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করেন। এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে সহজে পাওয়া যায় না। বিকল্প উৎস থেকে সংগ্রহ করতে গেলেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

নির্বাচনের আগে শুল্কনীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে রিপাবলিকান পার্টি। মেইন অঙ্গরাজ্যে সিনেটর সুসান কলিন্স পুনর্নির্বাচনের কঠিন লড়াইয়ে রয়েছেন। শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সমস্যা সমাধানে তিনি হোয়াইট হাউসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

কলিন্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসন ট্রাম্পের শুল্কনীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, এই বাণিজ্যযুদ্ধ মেইনের মানুষের জীবনকে আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল করেছে। তিনি বলেন, শুল্কনীতির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য কলিন্সেরও রাজনৈতিক দায় রয়েছে।

অন্যদিকে, সিনেটের অর্থবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রন ওয়াইডেন বলেছেন, নির্বাচনের ঠিক আগে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কলিন্সের রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষার চেষ্টা। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোকে নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু পণ্যের জন্য বেশি দাম দিতে হচ্ছে।

পাল্টাপাল্টি শুল্কে চাপে দুই দেশের বাণিজ্য

গত আগস্টে কানাডা থেকে আমদানি করা প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। দুই দেশের আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর এই শুল্ক কার্যকর হয়। এর জবাবে সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করে কানাডা।

এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে শুল্কবিরোধ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার ট্রাম্প দাবি করেন, কানাডা একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য কাজ করছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিডলটন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কানাডার বৈষম্যমূলক আচরণ মোকাবিলায় ট্রাম্প কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আগে ঘোষিত শুল্কের পরিধি আরও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

কানাডার যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক পরিবর্তন পর্যালোচনা করছে অটোয়া। তিনি বলেন, কানাডার স্বার্থের প্রতি সম্মান রেখে উভয় দেশের জন্য আরও লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে তাঁর দেশ গঠনমূলক আলোচনায় প্রস্তুত।

মেইন ও মিশিগানে বাণিজ্যনীতি নির্বাচনী ইস্যু

কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্য মেইন ও মিশিগানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। গাড়ির যন্ত্রাংশ, কাঠ এবং ফল সংগ্রহের যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্যে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।

এ কারণে এসব অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান প্রার্থীদের একদিকে ট্রাম্পের সমর্থকদের সন্তুষ্ট রাখা, অন্যদিকে স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্স আগে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে শুক্রবার তিনি কানাডা থেকে আসা বর্জ্যের ওপর শুল্ক আরোপের পক্ষে ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করেন।

এদিকে, কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বম্বার্ডিয়ারকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে বাধা দেওয়ার হুমকিও সম্প্রতি রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়েছে। কানসাসের উইচিটা শহরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মী কাজ করেন। কানসাসের কয়েকজন আইনপ্রণেতা, যাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালও রয়েছেন, উদ্যোগ নেওয়ার পর চলতি সপ্তাহে সেই নিষেধাজ্ঞার হুমকি প্রত্যাহার করেন ট্রাম্প।

সামগ্রিকভাবে, কানাডার পণ্যে শুল্কছাড়ের এই সিদ্ধান্ত সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর কৃষি ও ব্যবসা খাতে স্বস্তি দিতে পারে। তবে নতুন শুল্কতালিকা এবং দুই দেশের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।