কৃষি খবর ডেস্ক: দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত উৎপাদন হলেও সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় নষ্ট হয় বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় বাংলাদেশকে। এই সমস্যা সমাধানে ইন্টারনেটভিত্তিক সংযুক্ত প্রযুক্তি ও সেন্সর ব্যবহার করে পেঁয়াজ সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি উদ্ভাবনের কাজ করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। প্রাথমিক পরীক্ষায় এই প্রযুক্তিতে সংরক্ষণকালীন ক্ষতি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে।
৫০০ কেজি পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাবে
গবেষকেরা এমন একটি বিশেষ সংরক্ষণ পাত্র তৈরি করছেন, যেখানে একসঙ্গে ৫০০ কেজি পেঁয়াজ রাখা যাবে। ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণকক্ষের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অন্যান্য পরিবেশগত অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক রোস্তম আলী। তিনি জানান, তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই গবেষণার মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে পেঁয়াজের গুণগত মান দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
স্থাপন ব্যয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই সংরক্ষণব্যবস্থা স্থাপন করতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। যথাযথভাবে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এটি অন্তত ১০ বছর কাজে লাগানো সম্ভব।
এতে বিদ্যুৎ খরচও কম হবে বলে আশা করছেন গবেষকেরা। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে বিদ্যুতের ব্যয় আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
সেন্সর নিয়ন্ত্রণ করবে বাতাস চলাচল
এই প্রযুক্তিতে সংরক্ষণ পাত্রের ভেতরের পরিবেশের পরিবর্তন শনাক্ত করতে সেন্সর ব্যবহার করা হবে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন অনুযায়ী বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করা হবে। প্রয়োজন অনুসারে পাখার কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণ করবে প্রযুক্তিটি।
গবেষকদের মতে, সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে পারলে পেঁয়াজ পচে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া, অঙ্কুর গজানো এবং গুণগত মান নষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা কমানো সম্ভব হতে পারে।
গবেষণায় মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফল
২০২৫ সালের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে গবেষণাটি শুরু হয়। এখন পর্যন্ত পরীক্ষায় পেঁয়াজের সংরক্ষণজনিত ক্ষতি কমানোর বিষয়ে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
গবেষকেরা বর্তমানে পেঁয়াজের ওজন হ্রাস, পচন, অঙ্কুরোদ্গম এবং গুণগত মানের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছেন। ফলাফল সন্তোষজনক থাকলে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে পরীক্ষামূলকভাবে প্রযুক্তিটি মাঠপর্যায়ে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
গবেষকদের আশা, সবকিছু অনুকূলে থাকলে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে কৃষকদের ব্যবহার উপযোগী একটি মডেল তৈরি করা সম্ভব হবে।
উৎপাদন বেশি, তবু আমদানি করতে হয়
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪২ লাখ ৬৪ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। বিপরীতে দেশে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন।
অর্থাৎ, উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও সংরক্ষণসংক্রান্ত সমস্যা ও বছরের বিভিন্ন সময়ে সরবরাহের ঘাটতির কারণে আমদানি করতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ৮৬ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে।
গবেষকদের প্রত্যাশা, কম খরচে আধুনিক সংরক্ষণপ্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছানো গেলে পেঁয়াজের অপচয় কমবে, সংরক্ষণকাল বাড়বে এবং মৌসুমি সরবরাহের চাপ সামলানো সহজ হবে।






