কৃষি খবর ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ কমাতে কৃষকদের জন্য করমুক্ত লাল ডিজেল ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সড়কে চলাচলকারী ট্রাকে এ জ্বালানি ব্যবহারে আইনি জটিলতা ও জরিমানার ঝুঁকি থাকায় অনেক কৃষকই এই সুবিধা নিতে আগ্রহী নন। অন্যদিকে, সাধারণ চালকদের অনেকেই সহজে লাল ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছেন না।
চলতি মাসে সই করা এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প কৃষিযন্ত্রে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত লাল রঙের ডিজেল সড়কে চলাচলকারী যানবাহনে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দিয়েছেন। সাধারণ ডিজেলের মতোই এ জ্বালানি ব্যবহার করা যায়, তবে এতে মহাসড়কের জ্বালানি কর দিতে হয় না। কর পরিশোধ করা হয়নি—এটি বোঝাতে ডিজেলে লাল রং মেশানো হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে সোমবার কৃষকদের শরৎকালীন ফসল কাটার মৌসুমে ডিজেলের বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে ৮০০ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়টিও রয়েছে।
এ ছাড়া রাশিয়ার জ্বালানি পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল, মিত্র দেশগুলোকে জরুরি তেলের মজুত বাজারে ছাড়তে উৎসাহিত করা এবং বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজের যুক্তরাষ্ট্রের এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে চলাচলে সাময়িক বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিয়েছে প্রশাসন। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম এখনো বেশি রয়েছে।
সামান্য সাশ্রয়ের জন্য বড় ঝুঁকি নিতে চান না কৃষকেরা
ট্রাম্পের আদেশ অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সড়কে লাল ডিজেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জরিমানা আরোপ করা হবে না বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগ। তবে এ ছাড়ের ফলে অঙ্গরাজ্যগুলোর নিজস্ব কর ও জরিমানার নিয়ম পরিবর্তিত হয়নি।
কানসাস ফার্ম ব্যুরোর সভাপতি গ্লেন ব্রাঙ্কো বলেন, মহাসড়কে চলাচলকারী ভারী ট্রাকে লাল ডিজেল ব্যবহার করে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা জ্বালানির ট্যাংকে লাল রঙের অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়ার ঝুঁকির তুলনায় খুবই সামান্য।
তিনি বলেন, “আমার বিবেচনায়, ঝুঁকি নেওয়ার মতো সাশ্রয় এটি নয়। ওই রঙের অবশিষ্টাংশ ট্যাংকে বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে।”
কৃষকেরা সাধারণত শরৎকালে ফসল কাটার সময় সবচেয়ে বেশি ডিজেল ব্যবহার করেন। ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রে লাল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। নতুন আদেশের আওতায় অঙ্গরাজ্যের নিয়ম অনুমোদন করলে একই জ্বালানি দিয়ে ফসল পরিবহনের ট্রাকও চালানো সম্ভব হতে পারে।
কানসাসে জরিমানা ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শস্য উৎপাদনকারী অঙ্গরাজ্য কানসাসে নির্দিষ্ট আইনি ব্যতিক্রম ছাড়া সরকারি সড়কে লাল ডিজেল ব্যবহার নিষিদ্ধ। অঙ্গরাজ্যের রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিয়ম ভাঙলে অপরাধের অভিযোগ, চালকের লাইসেন্স স্থগিত এবং ১ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
কানসাসের ডেমোক্র্যাট গভর্নর লরা কেলি বলেছেন, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, সে অনুযায়ী অঙ্গরাজ্যের পক্ষে আইনগতভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
তিনি জানান, লাল ডিজেল ব্যবহারের সাময়িক ছাড় শেষ হয়ে স্বাভাবিক বিধিনিষেধ আবার কার্যকর হলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে কানসাস হাইওয়ে প্যাট্রোল উদ্বেগ জানিয়েছে।
এদিকে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কৃষি খাতে বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে দলটির নেতারা আশা করছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স জানিয়েছেন, ট্রাম্প জ্বালানির দাম কমাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর ভাষ্য, প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যয় কমানো এবং সাধারণ পরিবারের হাতে আরও অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া।
সাশ্রয় হলেও বাড়তি ব্যয়ের তুলনায় কম
মিনেসোটার কৃষক জে সরগের হিসাব অনুযায়ী, নতুন আদেশের ফলে তাঁর প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলার সাশ্রয় হতে পারে। তবে জ্বালানি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের বাড়তি ব্যয়ের তুলনায় এই অর্থ খুব বেশি নয়।
অনেক কৃষকের মতো সরগও আগাম ডিজেল কিনে ট্যাংকে মজুত রাখেন। ফলে মহাসড়কে ব্যবহারের জন্য কেনা জ্বালানির পরিবর্তে লাল ডিজেল ব্যবহারের সুযোগ তাঁর জন্য খুব একটা কার্যকর নয়।
তিনি বলেন, সামগ্রিক ব্যবসার হিসাবে এই সাশ্রয় তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিশেষ করে যখন সড়কে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আগেই কিনে মজুত করা হয়েছে। তাঁর মতে, এটি ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা।
সাউথ ডাকোটার কৃষক রায়ান ওয়াগনারের আশঙ্কা, করমুক্ত লাল ডিজেলের ব্যবহার বেড়ে গেলে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহৃত সরকারি তহবিলের আয় কমে যেতে পারে। তাঁর মতে, এটি স্বল্পমেয়াদি চিন্তাভাবনার একটি উদ্যোগ, যার নেতিবাচক প্রভাব ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে।
সাধারণ চালকদের জন্যও সহজ নয় লাল ডিজেল পাওয়া
কৃষকদের পাশাপাশি সাধারণ চালকেরাও লাল ডিজেল ব্যবহারের সুযোগ নিতে চাইলেও তা সহজে সংগ্রহ করতে পারছেন না।
আইওয়ার রিপাবলিকান গভর্নর কিম রেনল্ডস একটি ঘোষণার মাধ্যমে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্দিষ্ট কৃষিপণ্য পরিবহনকারী যানবাহনের জন্য সড়কে লাল ডিজেল ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, টেক্সাসে এ সুবিধা নিতে চালকদের অঙ্গরাজ্যের কাছে নিবন্ধন করতে হয়।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদক হিউস্টনের আশপাশে অনলাইনে লাল ডিজেল বিক্রির স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত চারটি জায়গা পরিদর্শন করেন। এসব স্থান বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জ্বালানি কার্ড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল। কিন্তু তিনটি স্থানে শুধু বাণিজ্যিক ডিজেল বিক্রি করা হচ্ছিল। চতুর্থ স্থানে লাল ডিজেলের পাম্প কাজ করছিল না। সেখানে টানানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, লাল ডিজেল শুধু কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য, সড়কে নয়।
হিউস্টনের দমকলকর্মী ভিনচেনজো লাসালসি ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় নিজের র্যাম ২৫০০ ট্রাকে লাল ডিজেল ব্যবহারের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু কোথায় তা পাওয়া যাবে, তা জানতেন না তিনি।
তিনি বলেন, “পেলেও হয়তো এত দূরে যেতে হবে যে, জ্বালানি ভরতে যাওয়ার খরচ ও ঝামেলা পোষাবে না।”
সব মিলিয়ে, করমুক্ত ডিজেল ব্যবহারে সাময়িক ছাড় দিয়ে কৃষকদের ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন আইন, সম্ভাব্য জরিমানা, জ্বালানির ট্যাংকে রঙের অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা এবং সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে এ সুবিধা বাস্তবে কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।





