কৃষি খবর ডেস্ক: কৃষি খাতের ব্যয় কমানো, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা এবং কৃষকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের বিধি শিথিল করার প্রস্তাব দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে নির্দিষ্ট কিছু কীটনাশকের অনুমোদন অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এতে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকেরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তাসংক্রান্ত আইন সহজ ও কার্যকর করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২০১১ সাল থেকে কার্যকর নিয়ম অনুযায়ী, কীটনাশকের মূল কার্যকর উপাদান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনুমোদন পায়। এ অনুমোদনের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বছর।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত সংস্কারে কার্যকর উপাদানগুলোর অনুমোদন অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল রাখাই সাধারণ নিয়ম করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে বহুল আলোচিত গ্লাইফোসেটের মতো কীটনাশকের অনুমোদনও নির্দিষ্ট সময় পরপর বাধ্যতামূলক পুনর্মূল্যায়নের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, নিরাপত্তা পর্যালোচনার দায়িত্ব মূলত নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের ওপর থাকবে, সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নয়।

কেন কীটনাশকের নিয়ম শিথিল করতে চায় ইউরোপীয় কমিশন?

ইউরোপীয় কমিশনের দাবি, কীটনাশক ব্যবহারের বিধি নিয়ে কৃষক ও কৃষিশিল্পের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং অনুমোদন পেতে অতিরিক্ত সময় লাগার কারণে কৃষকেরা ফসলের পোকামাকড়, আগাছা ও রোগ দমনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর সমাধান পেতে সমস্যায় পড়ছেন।

গত মে মাসে ইউরোপের ১৯টি খাদ্য ও কৃষিসংশ্লিষ্ট সংগঠন একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। এসব সংগঠনের মধ্যে কীটনাশক ব্যবহারের পক্ষে কাজ করা ক্রপলাইফ ইউরোপও ছিল।

বিবৃতিতে বলা হয়, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ অনুমোদনব্যবস্থার কারণে কৃষকেরা ফসলের পোকামাকড়, আগাছা ও রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর সমাধান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে খাদ্যনিরাপত্তা এবং কৃষকদের জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেস সার্ভিস ডয়চে ভেলেকে জানায়, কার্যকর প্রতিটি উপাদানের নিয়মিত অনুমোদন নবায়ন ও মূল্যায়নের বর্তমান ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকছে না। নতুন ও তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক জটিলতাও কমানো প্রয়োজন বলে মনে করে কমিশন।

গ্লাইফোসেট নিয়ে কেন উদ্বেগ?

গ্লাইফোসেট একটি বহুল ব্যবহৃত আগাছানাশক, যা বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ধ্বংস করতে পারে। এর ব্যবহার ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবের সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনার বাধ্যবাধকতা কমে গেলে কীটনাশকের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া দুর্বল হতে পারে। বিশেষ করে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর এসব রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকেরা।

তবে কমিশনের বক্তব্য, প্রস্তাবটির লক্ষ্য ব্যয় কমানো, কর্তৃপক্ষের কাজ সহজ করা এবং কৃষকদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করা।

কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্যের প্রশ্ন

একদিকে কৃষকেরা ফসলের ক্ষতি কমাতে কার্যকর বালাইনাশক ও আগাছানাশকের সহজলভ্যতা চান। অন্যদিকে, এসব রাসায়নিকের নিরাপদ ব্যবহার এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় হলো—অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি কীভাবে মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কীটনাশক অনুমোদন ও পর্যালোচনাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নিয়ম শিথিল করার ফলে কৃষকদের সুবিধা এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে, তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।