কৃষি খবর ডেস্ক: ফসলের দাম কমার বিপরীতে জ্বালানি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কৃষকদের ওপর চাপ বাড়ছে। এর প্রতিবাদে গত ২ অক্টোবর পর্তুগাল ও স্পেনকে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। শরৎকালীন নতুন চাষাবাদ মৌসুম শুরুর সময় এই বিক্ষোভকে কৃষকদের আয় সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দক্ষিণ পর্তুগালের সেরপায় ওইদিন সকালে কয়েক ডজন ট্রাক্টর ও কৃষিযান নিয়ে ন্যাশনাল রোড ২৬০ অবরোধ করেন কৃষকরা। এতে প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে যানজট তৈরি হয় এবং স্পেন সীমান্তের দিকে যাওয়া পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেরপা এগ্রিকালচারাল প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন এই কর্মসূচির আয়োজন করে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে নতুন চাষের মৌসুমে অনেক কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শুধু জরুরি স্প্যানিশ পণ্যবাহী যানবাহনগুলোকে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়।

পর্তুগালের কৃষিমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল ফার্নান্দেস বলেন, কৃষকদের এমন বিক্ষোভের কারণ বোঝা যায়। তবে শুধু বিক্ষোভ করে সমস্যার সমাধান হবে না। অনিশ্চিত উৎপাদন ব্যয় মোকাবিলায় কৃষকদের আরও বেশি আর্থিক সুবিধা ও নমনীয়তা প্রয়োজন।

পর্তুগালের এই বিক্ষোভ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই সংকট নিয়ে স্পেনের কৃষক সংগঠন আসাজা, কোয়াগ ও ইউপিএ দেশজুড়ে বিক্ষোভের আয়োজন করছে অথবা কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে, রেকর্ড জ্বালানি মূল্যের প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্সের কৃষক ও জেলেদেরও আলাদা বিক্ষোভ হয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের নতুন তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে কৃষিপণ্যের উৎপাদনমূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এটি টানা তৃতীয় প্রান্তিক, যখন কৃষিপণ্যের দাম কমল। বিপরীতে একই সময়ে কৃষি উৎপাদনের উপকরণগুলোর দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে দুধের দাম সবচেয়ে বেশি কমেছে—১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। শস্যের দাম কমেছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

ইইউর ২০টি সদস্য দেশে কৃষিপণ্যের দাম কমেছে। সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে ডেনমার্কে—১৭ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর রয়েছে আয়ারল্যান্ড—১৬ দশমিক ২ শতাংশ।

অন্যদিকে, উৎপাদন খরচের দিক থেকে পরিস্থিতি আরও কঠিন। পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নে জ্বালানি ও লুব্রিকেন্টের দাম ২২ শতাংশ এবং সারের দাম ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। কৃষি উপকরণের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে লিথুয়ানিয়ায়—১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। রোমানিয়ায় বেড়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

কৃষকদের এই সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় কমিশন ইতোমধ্যে কিছু অর্থ বরাদ্দ করেছে। জুলাইয়ে মূল্যপতনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে ৫৪ কোটি ইউরো বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে ফ্রান্স পেয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৭০ লাখ ইউরো এবং স্পেন পেয়েছে প্রায় ৫ কোটি ইউরো।

কারণ, শরৎকালীন বপনের সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জমিতে নতুন ফসল লাগানোর ক্ষেত্রে ডিজেল একটি অপরিহার্য উপকরণ। চলতি বছরের ফসল থেকে যদি কৃষকের লাভ খুব কম হয়, এমনকি লোকসানও হয়, তাহলে পরবর্তী ফসল মাঠে যাওয়ার আগেই জ্বালানির দাম আরও বাড়লে সেই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করার সামর্থ্য অনেক কৃষকেরই থাকবে না।

সুত্র: গ্লোবাল এগ্রিকালচার