কৃষি খবর ডেস্ক: কৃষকের চোখে ফসলের জমিতে পোকা দেখা মানেই অনেক সময় বিপদের সংকেত। পাতায় পোকা, গাছে পোকার ক্ষত বা ফলের গায়ে দাগ দেখলেই কীটনাশক প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কৃষক না জেনে না বুঝেই উপকারী পোকামাকড় মেরে ফেলছেন। কিন্তু কৃষিবিজ্ঞানের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। জমিতে থাকা প্রতিটি পোকা ফসলের শত্রু নয়। বরং অসংখ্য পোকা কৃষি-প্রতিবেশব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কেউ পরাগায়নে সহায়তা করে, কেউ ক্ষতিকর পোকার ডিম ও লার্ভা খেয়ে ফেলে, কেউ মাটির জৈবিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ পোকা মানেই অপকারী, এই ধারণা কৃষির জন্য বিপজ্জনক।

কৃষিজমির পোকামাকড়ের বৈচিত্র্য একটি এলাকার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করতে পারে। অথচ নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি উপকারী পোকাও মারা যায়। এর ফলে প্রকৃতির নিজস্ব পোকা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যদি আমরা কৃষির জীববৈচিত্র্য নষ্ট করি, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই কৃষিই আরও বেশি রাসায়নিক নির্ভর হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রশ্ন শুধু কীটনাশক ব্যবহার করব কি না, এটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো কখন, কেন, কোন পোকায়, কোন পদ্ধতিতে এবং কতটুকু ব্যবহার করব? কৃষক না জেনে উপকারী পোকা মেরে ফেলছেন।

সঠিক পোকা চেনা
প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে, সমস্যাটি আসলে কী? কোন পোকা? কোন রোগ? নাকি অন্য কোনো কারণে গাছের ক্ষতি হচ্ছে? শুধু পাতায় ছিদ্র দেখেই কীটনাশক প্রয়োগ করা ঠিক নয়। ছবি, মাঠ পর্যবেক্ষণ, কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং প্রয়োজন হলে ডিজিটাল এআই-ভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। ভুল পোকা শনাক্ত করে সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।

সঠিক সময়
পোকা দেখা গেলেই সঙ্গে সঙ্গে স্প্রে করার প্রয়োজন নেই। পোকার জীবনচক্র, আক্রান্ত ফসলের বয়স, পোকার সংখ্যা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি বিবেচনা করতে হবে। আইআরএসি-এর নির্দেশনাতেও কীটনাশক প্রয়োগের সময় সঠিকভাবে নির্ধারণ এবং ক্ষতিকর পোকার অর্থনৈতিক মাত্রা বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সময় ভুল হলে ভালো ওষুধও অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

সঠিক নির্বাচন
যদি কীটনাশক ব্যবহার করতেই হয়, তবে পোকার জন্য নিবন্ধিত ও উপযুক্ত পণ্য নির্বাচন করতে হবে। শুধু ব্র্যান্ডের নাম পরিবর্তন করলেই কীটনাশকের কার্যপদ্ধতি পরিবর্তন হয় না। প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনায় কার্যপদ্ধতি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই কৃষি পরামর্শ ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ে। কৃষককে জানতে হবে কোন পণ্য কোন পোকার বিরুদ্ধে, কোন মাত্রায় এবং কী ধরনের কার্যপদ্ধতিতে কাজ করে।

সঠিক প্রয়োগ
সঠিক ওষুধ, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময়, সবকিছু ঠিক থাকার পরও প্রয়োগ পদ্ধতি ভুল হলে ফল পাওয়া যাবে না। তাই লেবেল নির্দেশনা, নির্ধারিত মাত্রা, স্প্রে ব্যবধান, নিরাপত্তা বিধি এবং ফসল কাটার আগে অপেক্ষাকাল মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে বাতাস, বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও মাঠের অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বারবার স্প্রে না করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, প্রয়োগের পর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া গেছে কি না।

কৃষিতে নতুন দর্শন: পোকা দমন নয়, পোকা ব্যবস্থাপনা
আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। ‘পোকা দেখলেই মেরে ফেলতে হবে’ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ‘ক্ষতিকর পোকাকে অর্থনৈতিক ক্ষতির সীমার নিচে রাখতে হবে’ এই বৈজ্ঞানিক ধারণায় যেতে হবে। এ জন্য কৃষকের প্রশিক্ষণ, ডিলারদের দায়িত্বশীলতা, মাঠ পর্যায়ের পরামর্শ, কীটনাশক ব্যবহারের রেকর্ড, সঠিক লেবেলিং এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থায় আইপিএম, উপকারী পোকা শনাক্তকরণ ও সংরক্ষণকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

কৃষকের জমিতে থাকা প্রতিটি পোকা শত্রু নয়। অনেক পোকাই কৃষকের অদৃশ্য সহযোগী। তারা ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে, পরাগায়নে সহায়তা করে এবং কৃষি-প্রতিবেশব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই নির্বিচারে পোকা নিধন শেষ পর্যন্ত কৃষির নিজের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দুর্বল করতে পারে। অতিরিক্ত ও ভুল কীটনাশক ব্যবহারের ফলে থ্রি আর-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর বিপরীতে কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ফোর আর নীতি অনুসরণ করা জরুরি।

একই সঙ্গে বায়োপেস্টিসাইড, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, ফসল ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য আইপিএম/জিএপি পদ্ধতিকে মূলধারায় আনতে হবে। কারণ টেকসই কৃষির লক্ষ্য শুধু আজকের পোকা দমন নয়; আগামী দিনের মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষকের আয় সুরক্ষাও। কৃষির ভবিষ্যৎ তাই ‘বেশি কীটনাশক’ নয়; বেশি জ্ঞান, বেশি পর্যবেক্ষণ, সঠিক প্রযুক্তি এবং কম অপ্রয়োজনীয় প্রয়োগ। পোকাকে শুধু শত্রু হিসেবে না দেখে কৃষি-প্রতিবেশের অংশ হিসেবে দেখার সময় এসেছে। পোকা চিনুন, প্রয়োজন বুঝুন, ফোর আর মানুন, আর কৃষিকে ফিরিয়ে দিন তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪