কৃষি খবর ডেস্ক: সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে একমাত্র বোরো ধানের ওপর। তবে অকাল বন্যা, পানি সংকট, মানসম্মত বীজ ও কৃষি উপকরণের ঘাটতিসহ নানা সমস্যায় প্রতিবছরই ঝুঁকিতে থাকে হাওরের কৃষি।

এই পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের কৃষিকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে কাজ করছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট—বিনা।

সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের কৃষকদের সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনভিত্তিক গবেষণা এবং বিনার উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে বিনার সুনামগঞ্জ উপকেন্দ্র।

পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের উপযোগী জাতগুলো বিদ্যমান শস্য বিন্যাসে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।

বিনার পরিচালক গবেষণা ড. মাহবুবা কানিজ হাসনা জানান, কৃষকদের নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণের প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন অঞ্চল উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে বিনা ধান-২৪, বিনা ধান-২৫, বিনা ধান-১৯, বিনা সরিষা-১১, বিনা চিনাবাদাম-৪ ও বিনা চিনাবাদাম-৮সহ বিভিন্ন জাত।

তবে হাওরের কৃষিতে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে পানি। কৃষি যন্ত্রপাতি, মানসম্মত বীজ ও অন্যান্য উপকরণের সংকটও রয়েছে। পাশাপাশি জমির মালিকানা ও বর্গাচাষের বিষয়টিও কৃষি পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, এসব সমস্যা চিহ্নিত করে কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সরবরাহ করতে হবে। অনাবাদি জমি চাষের আওতায় এনে উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোরও সুযোগ রয়েছে।

বিনা সুনামগঞ্জ উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শেফাউর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত ১৩৯টি জাত উদ্ভাবন করেছে বিনা। এর মধ্যে ৯৬টি জাত মিউটেশন পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত।

বিনার গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মাহবুবুল আলম তরফদার বলেন, উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি আরও ব্যাপকভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও কৃষকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

হাওরাঞ্চলের কৃষিতে পানি সংকটের পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি, মানসম্মত বীজ ও অন্যান্য উপকরণের ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন বিনার কর্মকর্তারা।

তাদের মতে, রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো, খাল খনন, কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি সুবিধা জোরদারসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শান্তিগঞ্জের কৃষক সৈয়দুল ইসলাম জানান, তার এলাকায় বিনার পদ্ধতিতে ধান চাষ করে অনেক কৃষক লাভবান হয়েছেন। তাই এ পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য আরও বেশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক আজিজুর রহমান বলেন, প্রতিবছর হাওরে বোরো ধান চাষ করলেও অকাল বন্যায় অনেক সময় ফসল তলিয়ে যায়। তাই সময়োপযোগী কৃষি পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণ পেলে কৃষকরা উপকৃত হবেন।

কৃষি বিভাগও বলছে, গবেষণার মাধ্যমে উন্নত জাতের ধান ও অন্যান্য ফসল চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

হাওরের কৃষিকে অকাল বন্যা ও নানা সংকটের ঝুঁকি থেকে বের করে উৎপাদন বাড়াতে এখন প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার। আর সেই লক্ষ্যেই বিনার উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি আরও বেশি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবি উঠছে হাওরাঞ্চল থেকে।

সূত্র: বাসস