কৃষি খবর ডেস্ক: একাধিক উদ্যোগে লোকসান, তবু দমে যাননি মেহেরপুরের দিলরুবা খাতুন। মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ১০০টি হাঁসের বাচ্চা দিয়ে শুরু করেন খামার। তিন বছরের ব্যবধানে সেই খামারে এখন প্রায় এক হাজার হাঁস। পাশাপাশি ইনকিউবেটরে প্রতি সপ্তাহে উৎপাদন করছেন প্রায় দুই হাজার হাঁসের বাচ্চা। হাঁস পালন ও বাচ্চা বিক্রি থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে মাসে প্রায় চার লাখ টাকা আয় করছেন এই নারী উদ্যোক্তা।
দিলরুবা খাতুনের উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা অবশ্য এতটা মসৃণ ছিল না। প্রথমে তিনি বাজরিকা পাখি পালন শুরু করেন। কিন্তু করোনাকালে লোকসানের মুখে পড়ে সেই উদ্যোগে ধাক্কা খান। এরপর নতুন আশায় ব্রয়লার মুরগির খামার গড়ে তোলেন। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় বার্ড ফ্লু। ধারাবাহিক ক্ষতিতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিজের উদ্যোগ গড়ে তোলার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি।
শেষ পর্যন্ত বিকল্প হিসেবে হাঁস পালনের সিদ্ধান্ত নেন দিলরুবা। প্রায় তিন বছর আগে মাত্র ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে পিকিং স্টার-১৩ জাতের ১০০টি হাঁসের বাচ্চা কেনেন। সীমিত পুঁজি নিয়ে শুরু হয় তার নতুন পথচলা। নিয়মিত পরিচর্যা, পরিশ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে খামার। একসময় ছোট পরিসরে শুরু করা সেই উদ্যোগই পরিণত হয় সম্ভাবনাময় খামারে। বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা প্রায় এক হাজার।
দিলরুবা খাতুন জানান, শুরুতে একাধিক উদ্যোগে লোকসান হওয়ায় হতাশ হয়েছিলেন। তবে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অল্প পুঁজি দিয়ে হাঁস পালন শুরু করলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করার পরিকল্পনা করেন। এখন হাঁসের বাচ্চার চাহিদা থাকায় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে খামার আরও সম্প্রসারণ করতে চান তিনি।
স্বামী সেলিম হোসেন জানান, স্ত্রীর এই সফলতার পেছনে রয়েছে অনেক পরিশ্রম, ধৈর্য ও অধ্যবসায়। শুরুতে কয়েকটি উদ্যোগে লোকসান হওয়ায় সে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু কখনো হাল ছাড়েনি। মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ১০০টি হাঁসের বাচ্চা দিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করে। আজ তার খামার ও ইনকিউবেটরের মাধ্যমে বাচ্চা উৎপাদনের উদ্যোগ অনেক বড় হয়েছে। আমি সব সময় তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তার এই সাফল্যে আমি গর্বিত।
ইনকিউবেটর মেশিন নিয়ন্ত্রণকারী টেকনিশিয়ান মওলা বক্স জানান, এই ইনকিউবেটর মেশিনের মাধ্যমে নিয়মিত হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়। মেশিনের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও ডিমের সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ত্রুটি হলে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার হার কমে যেতে পারে। তাই নিয়মিত মেশিনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হয়। বর্তমানে এখানে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। এসব বাচ্চা মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিরা সংগ্রহ করছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে অল্প সময়ে বেশি বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে পারলে এই উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং নতুন খামারিদের হাঁস পালনে উৎসাহ জোগাবে বলে আমি মনে করি।
মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, এ জেলায় হাঁস পালনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রামীণ পরিবেশ, উদ্যোক্তাদের আগ্রহ এবং বাজারে হাঁস ও হাঁসের বাচ্চার চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, হাঁস পালন লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হতে পারে, যদি খামারিরা সঠিক নিয়মে পালন করেন এবং রোগ প্রতিরোধে সচেতন থাকেন। নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, খামার ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে হাঁস পালন করা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব।
সূত্র: জাগো নিউজ






