কৃষি খবর ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের প্রায় প্রতি চারটি নদী ও জলধারার একটিতে আগাছানাশক অ্যাট্রাজিন এমন মাত্রায় পাওয়া গেছে, যা জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ তথ্য জানিয়েছে পরিবেশবিষয়ক সংগঠন সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি। সংগঠনটির দাবি, দেশটির প্রায় ১০ লাখ মাইল নদী ও জলপথ এই দূষণের আওতায় রয়েছে। দূষিত নদী থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূপৃষ্ঠের পানিনির্ভর পানীয় জল সংগ্রহকেন্দ্রগুলোর প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পানি সংগ্রহ করে।
ভুট্টা ও আখের চাষে ব্যাপক ব্যবহার
অ্যাট্রাজিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল ব্যবহৃত আগাছানাশকগুলোর একটি। গ্লাইফোসেটের পর এটি দেশটির দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত আগাছানাশক। প্রতিবছর প্রায় ৭ কোটি পাউন্ড অ্যাট্রাজিন ব্যবহার করা হয়। মূলত ভুট্টা, জোয়ার ও আখের জমিতে বিস্তৃত পাতার ও ঘাসজাতীয় আগাছা দমনে এটি প্রয়োগ করা হয়।
গবেষকেরা নদী ও জলধারার পানিতে অ্যাট্রাজিনের উপস্থিতি-সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইপিএ) নির্ধারিত জলজ প্রাণীর সুরক্ষা-মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এতে দেখা গেছে, পর্যবেক্ষণ করা জলপথগুলোর প্রায় এক-চতুর্থাংশে অ্যাট্রাজিনের মাত্রা পরিবেশগত ঝুঁকি নির্ধারণে ব্যবহৃত সীমা ছাড়িয়েছে।
দূষণ কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের অধীনে ইপিএ অ্যাট্রাজিনের দূষণ কমাতে একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। এতে নদী অববাহিকাভিত্তিক পানিতে অ্যাট্রাজিনের ঘনত্বের সীমা নির্ধারণ করা হয়, যাতে জলজ পরিবেশে রাসায়নিকটির ক্ষতিকর প্রভাব কমানো যায়।
তবে সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও সবচেয়ে বেশি দূষিত জলপথগুলোর মাত্র ১ শতাংশকে নিরাপদ পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। সংগঠনটি এই তথ্যকে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের দূষণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
ইপিএর বিরুদ্ধে মামলা পরিবেশবাদীদের
অ্যাট্রাজিন দূষণ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গত ১৪ অক্টোবর ইপিএর বিরুদ্ধে মামলা করেছে সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি ও কয়েকটি সহযোগী পরিবেশবাদী সংগঠন। তাদের অভিযোগ, নদী-জলাশয় এবং পানীয় জলের উৎসকে অ্যাট্রাজিন দূষণ থেকে রক্ষায় ইপিএ যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
এটি ২০২০ সালে অ্যাট্রাজিন ব্যবহারের অনুমোদন পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে করা আগের মামলা থেকে আলাদা। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ দিকে নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলাটি এখনো স্থগিত রয়েছে। ইপিএ সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মূল্যায়ন নতুন করে পর্যালোচনা করছে।
ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ
২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ার পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন দপ্তর জানিয়েছে, রাজ্যটির প্রস্তাবনা ৬৫ কর্মসূচির আওতায় অ্যাট্রাজিনকে পরিচিত ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি তাদের প্রতিবেদনে অ্যাট্রাজিনের সংস্পর্শের সঙ্গে লিম্ফোমা, স্তন ক্যানসার, প্রজননক্ষমতা হ্রাস ও জন্মগত ত্রুটির সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে। তবে এসব তথ্য সংগঠনটির নিজস্ব গবেষণা-সারাংশের অংশ; এগুলো অ্যাট্রাজিনের ঝুঁকি নিয়ে ইপিএর নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। সংস্থাটির বর্তমান অনুমোদনেও রাসায়নিকটিকে এভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৬৩টি দেশে অ্যাট্রাজিন নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রে এর ব্যবহার আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তারা এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তুলে ধরে।
উৎপাদন ব্যয় কমানোর যুক্তি নির্মাতাদের
অ্যাট্রাজিনভিত্তিক আগাছানাশকের প্রধান উৎপাদক সিনজেনটা দাবি করে, পণ্যের নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করলে এটি নিরাপদ। কৃষি রাসায়নিক শিল্পের পক্ষ থেকেও বলা হয়, ভুট্টা ও জোয়ারের জমিতে আগাছা দমনে অ্যাট্রাজিন কার্যকর। এর ব্যবহার জমি কম চাষ করে উৎপাদন এবং সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে। ফলে কৃষিতে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা যুক্তি দেন।
বৈশ্বিক কৃষিবাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে
অ্যাট্রাজিনকে ঘিরে এই বিরোধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কীটনাশক নিয়ন্ত্রণনীতির পার্থক্যকে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিধিনিষেধ, অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের তালিকাভুক্তি কিংবা আদালতের বিরূপ রায় এলে ভুট্টা, জোয়ার ও আখ উৎপাদনকারীদের আগাছা দমন কৌশল এবং উৎপাদন ব্যয় প্রভাবিত হতে পারে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে অ্যাট্রাজিনভিত্তিক পণ্য নিবন্ধন ও বিক্রি করা প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানি বাজারে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের মান অনুসরণকারী পণ্য ক্রেতারাও নতুন নিয়মের প্রভাবের মুখে পড়তে পারেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অ্যাট্রাজিন আগে থেকেই নিষিদ্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন এলে বিশ্বের বড় দুই কৃষি রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যও কমতে পারে।
১৪ অক্টোবরের মামলা এবং নদী-জলধারার দূষণ নিয়ে নতুন বিশ্লেষণের বিষয়ে ইপিএ এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।





