কৃষি খবর ডেস্ক: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উপহার বিনিময় বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের প্রতীক। একটি দেশ অন্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে, মতবিরোধ মেটাতে কিংবা চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছাতে যে কৌশল ব্যবহার করে তাকে সহজ ভাষায় ডিপ্লোমেসি বা কূটনীতি বলে। এমন কূটনীতির বিভিন্ন উদাহরণের মধ্যে একটা যুক্তরাষ্ট্র-জাপানের ‘ফিশ ডিপ্লোমেসি’।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুদেশের সম্পর্ক সরলীকরণে ‘ফিশ ডিপ্লোমেসি’ পারস্পরিক আস্থার প্রতীক এবং সহযোগিতার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় যা পরবর্তীতে জাপানের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
সালটা ১৯৬০; অক্টোবর মাসের ৩ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো সফরে যান তৎকালীন জাপানের যুবরাজ আকিহিতো। মাছবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ২৬ বছর বয়সী আকিহিতোর ইচ্ছে হয় শিকাগোর বিখ্যাত শেড অ্যাকুয়ারিয়াম ঘুরে দেখার।
মাছের প্রতি গভীর অনুরাগী আকিহিতোর আগ্রহের কথা জেনে শেড অ্যাকুয়ারিয়ামে নিয়ে যান শিকাগোর তৎকালীন মেয়র রিচার্ড জে. ডেলি। পাশাপাশি বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে আকিহিতোকে উপহার দেন ১৮টি ‘ব্লুগিল মাছ’। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সরকারি প্রতীকী মাছ।
অ্যাকুয়ারিয়াম ঘুরে দেখার পরদিন স্ত্রী মিচিকোকে নিয়ে শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দর থেকে জাপানের উদ্দেশে রওনা হন আকিহিতো। সঙ্গে নিয়ে যান ছোট্ট সেই ১৮টি ব্লুগিল মাছ। কিন্তু জাপানের যুবরাজ কী জানতেন বন্ধুত্বের এই উপহার একদিন তার দেশের জলজ পরিবেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণ হয়ে উঠবে?
যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে জাপানে ফিরে জাতীয় মৎস্য সংস্থাকে ১৫টি ব্লুগিলের বংশবিস্তারের দায়িত্ব দেন আকিহিতো। তার পরিকল্পনা ছিল, মাছগুলোকে প্রজননের মাধ্যমে বাড়িয়ে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হবে। নতুন এই মাছকে যুবরাজের সম্মানে ‘প্রিন্স ফিশ’ নামে ডাকা শুরু হয়।
১৯৬৬ সালে ব্লুগিলের বংশধরদের জাপানের শিজুওকা প্রিফেকচারের ইতো শহরের কাছে ইপ্পেকি-কো হ্রদে ছাড়া হয়। তিন বছর পর সেখানে মাছটির সফল প্রবর্তন উদ্যাপনে একটি স্মৃতিস্তম্ভও স্থাপন করা হয়। এরপর জাপানের বিভিন্ন নদী ও হ্রদে আরও ব্লুগিল ছাড়া হয়।
তখন জাপানে বিদেশী প্রজাতির কারণে পরিবেশগত বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা খুব একটা ছিল না। দেশটির শিগা প্রিফেকচারে উত্তর আমেরিকার বহিরাগত মাছ নিয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে গবেষণা করা লেক বিয়া মিউজিয়ামের বিজ্ঞানী নাকাই কাৎসুকির জানান, ব্লুগিলের খাদ্যাভ্যাস দেখে তখন একে বিপজ্জনক শিকারি মাছ বলে মনে হয়নি।
উত্তর আমেরিকায় ব্লুগিল দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে এবং তুলনামূলক দীর্ঘজীবী হয়। জাপানের জলাশয়েও তারা নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। প্রথম দিকে পোকামাকড়, প্ল্যাঙ্কটন ও জলজ উদ্ভিদ খাওয়া এই মাছ পরে চিংড়ি এবং স্থানীয় মাছের ডিমও খেতে শুরু করে। স্থানীয় মাছের ডিম ও পোনা খাওয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনিষ্ট করতে শুরু করে ব্লুগিল।
১৯৯৯ সালের মধ্যে ব্লুগিল জাপানের প্রায় সব স্বাদুপানির জলজ প্রতিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। তখন সরকার এর বিস্তার নিয়ে গবেষণা শুরু করে। কিন্তু তত দিনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
দ্য জাপান টাইমসের তথ্য মতে, ২০০৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় টোকিওর ইম্পেরিয়াল প্যালেসের উশিগাফুচি পরিখায় মাছ ধরার অভিযান চালায়। জাল ফেলা মাত্রই ছয়টি ব্লুগিলের দেখা মেলে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৯ সালের জরিপে রাজপ্রাসাদ-সংলগ্ন পরিখাগুলোর একটিতে ধরা মাছের প্রায় ৪৭ শতাংশই ছিল ব্লুগিল। পুরো জরিপে আটটি পরিখায় ৪ হাজার ১৮৬টি ব্লুগিল পাওয়া গিয়েছিল।
ব্লুগিলের বিস্তারের উৎস অনুসন্ধানে ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান মাছের জিনতত্ত্ব ও বিবর্তনবিষয়ক গবেষক কেনজি সাইতোহ। তখন জাপানের বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি বিতর্ক চলছিল। এ বিতর্কের বিষয় ছিল-দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ব্লুগিল কি একটি নির্দিষ্ট উৎস থেকে এসেছে, নাকি বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানি করা হয়েছিল?
জাপানের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন স্বাদুপানির হ্রদ লেক বিয়ায় ব্লুগিলের বিস্তার বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। সেখানে স্থানীয় ক্রুশিয়ান কার্পসহ বিভিন্ন মাছের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। খাদ্য ও আবাসস্থল নিয়ে প্রতিযোগিতা এবং স্থানীয় মাছের ডিম খাওয়ার কারণে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।
এর প্রভাব কেবল পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্থানীয় মাছের ওপর নির্ভরশীল মৎস্যজীবী, মাছ ধরার ঐতিহ্য এবং স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আকিহিতোর ১৮টি ব্লুগিলের গল্পকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র–জাপান কূটনীতির ব্যর্থতা বলা যাবে না। কারণ মাছগুলোর বিস্তারের পেছনে পরবর্তী সময়ে প্রজনন, বিভিন্ন জলাশয়ে অবমুক্তকরণ এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডও ভূমিকা রেখেছে। তবে, ঘটনাটি আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের প্রতীকী উপহারের সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকির একটি বিরল যোগসূত্র তৈরি করেছে।
শিকাগোর ১৮টি ছোট মাছের গল্প আজও মনে করিয়ে দেয়-প্রকৃতির ভারসাম্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া একটি ছোট সিদ্ধান্তের মূল্য কয়েক প্রজন্মকে দিতে হতে পারে। আর সেই ক্ষতি মেরামত করতে গিয়ে বিজ্ঞানকে হয়তো এমন সব নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে যেগুলোর নিজেদের ঝুঁকিও এখনো পুরোপুরি জানা নেই।






