কৃষি খবর ডেস্ক: যে আঙুরক্ষেত একসময় তার পরিবারের স্থায়ী আয়ের উৎস ছিল, সেই জমি রক্ষায় এখন দিনের বেশিরভাগ সময় পাহারা দিয়ে কাটান ৫৬ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি কৃষক। অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের (সেটলারদের) হাত থেকে নিজের বাড়ি ও কৃষিজমি রক্ষা করাই এখন তার নিত্যদিনের সংগ্রাম। তাদের চারপাশের পাহাড়ে গড়ে ওঠা নতুন নতুন বসতি-চৌকির কারণে নিজের জমির কিছু অংশে যাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। এসব বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিদিন লড়াই করছেন তারা।

ফিলিস্থনি কৃষক থিবা বলেন, “আল্লাহর কসম, এই জমি আমাকে ধৈর্য শিখিয়েছে এবং নিজের অধিকারের জন্য লড়ে যেতে শিখিয়েছে। যতক্ষণ এই জমির ওপর আমার অধিকার আছে, ততক্ষণ আমি তা আদায় করব এবং কখনো ছেড়ে দেব না।”

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আশপাশের পাহাড়ে বসতি স্থাপনকারীরা নতুন কয়েকটি বসতি-চৌকি স্থাপনের পর থেকেই থিবার প্রতিটি গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।প্রায়ই বসতি স্থাপনকারীরা তার বাড়ির সীমানার কাছে এসে ইচ্ছাকৃতভাবে গবাদিপশু ছেড়ে দেয়। এসব পশু চাষ করা জমিতে ঢুকে ফসল নষ্ট করে।

থিবা বলেন, “আমরা জমি চাষ করি, ঠিকঠাক করি, তারপর তারা ভেড়া নিয়ে আমাদের জমিতে ঢোকে। ভেড়াগুলো ফসল খায়, পায়ের নিচে পিষে ফেলে—কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।”“তারা যখনই কোনো নড়াচড়া দেখে বা কেউ জমিতে ঢোকে, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ওপর হামলা করে।” আট মাসের বেশি সময় ধরে খোঁয়াড়ে আটকে রাখা হয়েছে।

একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি পাশের জমির ৫৯ বছর বয়সী আনোয়ার সাবারনেহ। সাত ভাইয়ের যৌথ পরিবারের সদস্য তিনি।
বারবার বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও হয়রানির কারণে তার দুই ভাই নিজেদের জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

১৪ সদস্যের পরিবারের দায়িত্বে থাকা সাবারনেহের বাড়ি থেকে মাত্র প্রায় ৩০০ মিটার দূরে রয়েছে তার কয়েক দুনাম আঙুরক্ষেত। কিন্তু আক্রমণাত্মক বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতির কারণে সেখানে যাওয়া এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সাবারনেহ জানান, তার আঙুরক্ষেতে যাওয়া এবং সেখানে কাজ করার ওপরও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সেনাবাহিনী বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে নিয়ে এসে আমার কাছে অনুমতি চেয়েছে—যেন নিজের বাড়িতে, বাড়ির দরজার সামনে এবং নিজের জমিতে কাজ করতেও আমার অনুমতি প্রয়োজন।” কৃষকদের নিজেদের জমিতে নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণেরও অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বলে তিনি জানান। বসতি স্থাপনকারীদের হামলার আশঙ্কায় সাবারনেহের ভেড়াগুলোও আটকে রাখতে হচেছ। 

তিনি বলেন, “তারা যদি আমাকে ভেড়াগুলো বাইরে বের করতে দেখে, তাহলে বসতি স্থাপনকারীরা আমাকে ধাওয়া করে, ভেড়াগুলো ধরে নিয়ে যায় এবং চুরি করে।”তার সন্তানরা চুরি যাওয়া ভেড়া ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে ইসরায়েলি সেনারা তাদের আটক ও মারধর করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। 

উপনিবেশ ও প্রাচীর প্রতিরোধ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারী ও ইসরায়েলি সেনাদের মাধ্যমে মোট ১১,০৭৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩,৪৮৮টি হামলা বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে।

কমিশনের বসতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক হাসান ব্রেইজেহ বলেন, বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধই বহু মানুষকে তাদের কৃষিজমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করার প্রধান কারণ। ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়গুলোর প্রবেশপথে স্থাপন করা সামরিক গেটগুলো তাদের বাগান ও আঙুরক্ষেতে যাওয়ার সুযোগ আরও কঠিন করে তুলেছে।