কৃষি খবর ডেস্ক: মায়ের অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা পাটকলে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের হাইড্রো-কার্বনমুক্ত ব্যাগ। বছরে আয় ২০০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা। চাঙা হচ্ছে উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতি।

সৈয়দপুর রেলবাজারের এক কোনায় সাধারণ একটি দোকানে টিন বিক্রি করতেন এক ব্যবসায়ী। মূলধন বলতে কেবল সততা ও কঠোর পরিশ্রম আর মায়ের দেওয়া অনুপ্রেরণা। সেই সাধারণ ব্যবসায়ী আজ উত্তরবঙ্গের পাটশিল্পে এনেছেন আধুনিকতার জাদুকরি ছোঁয়া, গড়ে তুলেছেন ‘রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’।

বিশ্ববাজারে যখন প্লাস্টিকের দাপটে পাটের অস্তিত্ব বিপন্ন, ঠিক তখনই উদ্যোক্তা সুশীল কুমার দাসের হাত ধরে সৈয়দপুরের উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব ও শতভাগ পচনশীল পাটপণ্য রপ্তানি শুরু হয়। এখন জাপান, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। লোকসানের বৃত্তে থাকা হাজারো কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়ে এবং প্রায় সাত হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে এখন দেশের শিল্প খাতের এক অনন্য প্রতিষ্ঠান এটি। এই উদ্যোক্তার প্রচেষ্টায় রেলবাজারের সেই ছোট টিনের দোকান থেকে বিশ্বজয়ী পাটশিল্পের সফল ব্যবসা গড়ে উঠেছে।

সৈয়দপুর রেলওয়ে বাজার চিরকালই তার ২৪ ঘণ্টার কর্মচাঞ্চল্যের জন্য বিখ্যাত। সেই রেলবাজারেই একটি সাধারণ টিনের দোকান দিয়ে ব্যবসায়িক জীবন শুরু করেছিলেন সুশীল কুমার দাস। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল আরও বড় কিছু করার। এই স্বপ্ন নির্মাণে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা রানু। এরপর স্ত্রী শ্যামলী রানী দাসকে নিয়ে সুশীল কুমার শ্যামলী সিটি গ্রুপ এবং রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন শ্যামলী। এখন তিনি প্রয়াত।

সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁদের স্বাবলম্বী করার এক সুগভীর স্বপ্ন ছিল তাঁর। মায়ের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন আর উত্তরের কৃষকদের উৎপাদিত পাটের সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে ২০১০ সালে সুশীল কুমার দাসের হাত ধরে সৈয়দপুরের কামারপুকুর ইউনিয়নের কলাবাগান এলাকায় যাত্রা শুরু করে রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

শুরুটা খুব সহজ ছিল না। কিন্তু সুশীল কুমার দাস পণ্যের গুণগত মান ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেন। নিরলস প্রচেষ্টায় কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থায় আসে আধুনিকতার ছোঁয়া। এই আধুনিকায়নের প্রথম বড় স্বীকৃতিটি আসে ২০১৩ সালে। সে বছরই ৫০ হাজার ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

বর্তমানে সৈয়দপুরের এই কারখানায় উৎপাদিত পাটপণ্য জাপান, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, তুরস্ক, উগান্ডা, তানজানিয়া, নাইজেরিয়া, গাম্বিয়া, ঘানাসহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে সরাসরি রপ্তানি হচ্ছে। পাটপণ্য রপ্তানিতে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে সেরা রপ্তানিকারকের পুরস্কারও অর্জন করেছে।

পাটশিল্পের এই আধুনিকায়নে সফল হয়েও সুশীল কুমার দাস তাঁর পুরোনো টিনের ব্যবসার শিকড়কে ভুলে যাননি। বরং পাটের বাজারের সফলতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নতুন উদ্ভাবনী ভাবনায় শ্যামলী সিমেন্ট শিট মিলস লিমিটেড নামে একটি নতুন কারখানা স্থাপন করেছেন। এখানে সিমেন্ট ও অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণে পরিবেশবান্ধব রঙিন ঢেউটিন উৎপাদিত হচ্ছে। দামেও সাশ্রয়ী ও মজবুত হওয়ায় দেশের বাজার ছাড়িয়ে এই রঙিন ঢেউটিন এখন ভারতেও ব্যাপকভাবে রপ্তানি হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত করার পাশাপাশি আরও হাজারো বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

রানু অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুশীল কুমার দাস বলেন, ‘সরকার যদি শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে, তবে কারখানার উৎপাদন বর্তমানের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলো যদি দেশিয় পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টিতে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করে, তবে পাটপণ্যের রপ্তানি অন্তত ১০ গুণ বাড়ানো সম্ভব। নতুন বাজার সৃষ্টি হলে শিল্পের প্রসার ঘটবে, বেকারত্ব কমবে এবং মানুষের হাতে অর্থ থাকলে দেশের অর্থনীতির চাকাও দ্রুত ঘুরবে।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার হুইসেলের শব্দের সঙ্গে একসময় যে সোনালি আঁশের বাণিজ্য এই শহরকে সমৃদ্ধ করেছিল, তা আজ রানু অ্যাগ্রোর আধুনিক মেশিনের শব্দের সঙ্গে মিশে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। রেলবাজারের একটি ছোট টিনের দোকান থেকে উঠে এসে আধুনিক পাটশিল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার এই গল্প প্রমাণ করে—সঠিক উদ্যোগ, সততা, মেধা ও আধুনিকায়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের পাটশিল্প আজও বিশ্বজয় করতে সক্ষম। সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রানু অ্যাগ্রোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।

সূত্র: প্রথম আলো