কৃষি খবর ডেস্ক: একসময় কৃষকের কাছে কাকতাড়ুয়া ছিল ফসল রক্ষার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায়। শুধু পাখি তাড়ানো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিশ্বাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং কৃষিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা। অনেক কৃষকের ধারণা ছিল, জমিতে কাকতাড়ুয়া থাকলে পাখি, ইঁদুর কিংবা অন্যান্য প্রাণী সহজে ফসলের ক্ষতি করতে পারে না। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, এটি জমিকে অশুভ দৃষ্টি বা কুদৃষ্টি থেকেও রক্ষা করে। ফলে ফলন ভালো হয়, গোলাভর্তি ধান ওঠে।

ইতিহাস বলছে, ৩১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর সভ্যতায় প্রথম কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। নীলনদের অববাহিকার উর্বর পলিমাটিতে মিশরীয়রা চাষাবাদ করত। গম থেকে শুরু করে নানা রকমের শস্য খুব পরিশ্রম করে ফলাত তারা। কিন্তু পাখির উৎপাতে সেসব ফসল রক্ষা করা দায় হয়ে পড়েছিল মিশরীয়দের। ফসল রক্ষার জন্যে ফসলের ওপরে জাল বিছিয়ে পাখি ধরত তারা। ফসলও বাঁচত, পাখির মাংসও খাওয়া হতো। কিন্তু এভাবে পশুদের আটকানো যাচ্ছিল না। তখনই পাথর দিয়ে ভয়ালদর্শন কিছু কাঠামো সাজিয়ে খেতে দাঁড় করিয়ে রাখা শুরু হয়। সভ্যতার প্রথম কাকতাড়ুয়া সম্ভবত সেটাই ছিল।

বর্তমানে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে কাকতাড়ুয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক কৃষকই এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নন। একসময় যে কাকতাড়ুয়া ছিল প্রায় প্রতিটি ক্ষেতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এখন তা কেবল দু’একটি জমিতে চোখে পড়ে।

গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে ঘুরে দেখা যায়, সবুজ ধানক্ষেত কিংবা ভুট্টার জমির সারি থাকলেও আগের মতো আর কাকতাড়ুয়ার উপস্থিতি নেই। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে একটি-দুটি কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে থাকলেও তা এখন অনেকটাই ব্যতিক্রম।

কাকতাড়ুয়া তৈরির পদ্ধতিও অত্যন্ত সহজ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। সাধারণত কয়েকটি বাঁশ, খড়, দড়ি, পুরোনো কাপড় এবং একটি মাটির হাঁড়ি দিয়েই তৈরি করা হতো এটি। প্রথমে বাঁশ দিয়ে মানুষের শরীরের মতো কাঠামো বানানো হয়। এরপর খড় দিয়ে শরীরের আকৃতি দেওয়া হয়। মাথার জায়গায় বসানো হয় মাটির হাঁড়ি অথবা খড় পেঁচিয়ে গোলাকার আকৃতি তৈরি করা হয়। অনেকেই হাঁড়ির গায়ে সাদা রং বা কয়লা দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ এঁকে মানুষের মুখাবয়বের মতো করে তুলতেন। পরে গায়ে পরিয়ে দেওয়া হতো পুরোনো শার্ট, গেঞ্জি কিংবা লুঙ্গি। সবশেষে সেটিকে ফসলের জমির মাঝখানে পুঁতে দেওয়া হতো। দূর থেকে দেখতে একেবারেই মানুষের মতো মনে হওয়ায় কাক, শালিক, বক, ঘুঘুসহ নানা পাখি এবং অনেক বন্যপ্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে জমিতে নামতে সাহস পেত না।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক কৃষির যুগেও পরিবেশবান্ধব ও কম খরচের দেশীয় প্রযুক্তিগুলোর গুরুত্ব একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। বরং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে কাকতাড়ুয়ার মতো লোকজ কৌশল এখনো কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। এতে যেমন রাসায়নিকের ব্যবহার কিছুটা কমানো সম্ভব; তেমনই সংরক্ষিত থাকবে বাংলার কৃষি ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গও।

একসময় যে কাকতাড়ুয়া ছিল বাংলার মাঠের নিত্যসঙ্গী, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে বিরল দৃশ্য। আধুনিকতার দৌড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে কৃষকের সেই নীরব প্রহরী। অথচ এই সাধারণ খড়, বাঁশ আর পুরোনো কাপড়ে গড়া অবয়বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার কৃষি-ঐতিহ্য, লোকজ জ্ঞান ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অমূল্য স্মৃতি। তাই কাকতাড়ুয়াকে শুধু অতীতের একটি কৃষি উপকরণ হিসেবে নয় বরং বাংলার কৃষি-ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক হিসেবেও সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি।