কৃষি খবর ডেস্ক: হিমাগারের বারান্দায় পায়চারি করছিলেন কৃষক বোরহান উদ্দিন। নিজের জমিতে উৎপাদন করা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। আলুর দাম কেমন– জানতে চাইলে তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘হামরা (আমরা) মরি গেইনো মারা (গেলাম) বাহে ! আলুর দাম নাই। আর আলু আবাদ করবার নাই।’

বোরহান উদ্দিন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার চেংমারী গ্রামের বাসিন্দা। গত মৌসুমে ৫ বিঘা জমিতে টিভিএস, স্টিক ও শিল প্রজাতির আলু চাষ করেছিলেন। প্রতিকেজি টিভিএস ও স্টিক আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২৭ টাকার বেশি। হিমাগারের গেটে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকা কেজি দরে। এর ফলে, তাঁর প্রতিকেজিতে লোকসান গুণতে হবে ১৫ টাকা। বললেন, ‘গতবার আলু আবাদ করি ম্যালা ক্ষতি হইছে। এবার ভাবছিনু, গতবারের ক্ষতি পোষাইবে। কিন্তু, বিধিবাম ! সেইটা আর হইল না। এইবারও একই অবস্থা। ’

উপজেলার কানুদাসপাড়া গ্রামের কৃষক খোরশেদ আলী ও আমিনুর রহমানও জানালেন তাদের দুঃখের কথা। দুই ভাই এবার ৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। সিংহভাগ আলু হিমাগারে রেখেছেন লাভের আশায়। কিন্তু, তাদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ। উৎপাদনের চেয়ে বাজার কম। জানালেন, ‘অনেক আশা নিয়া হামরা (আমরা) আলুর বস্তা স্টোরোত (হিমাগার) থুইনো (রাখলাম)। কিন্তুক, কাম হইলনা। এবারও আলুর দাম নাই। এ্যালায় (এখন) আর আলু বেচপার নাই।’

কৃষকরা জানান, ৫৫ কেজির প্রতিবস্তা আলুর হিমাগার ভাড়া ৩৭৫ টাকা, খালি বস্তা কেনা ১০০ টাকা, হিমাগারে পরিবহন খরচ ৫০, লেবার ২০ টাকা, সার, কীটনাশক, পানিসেচ, বীজ, শ্রমিকসহ প্রায় ৮২৫ টাকা। হিমাগার গেট ১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে ৬৬০ টাকা। এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। অথচ ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন, যা উৎপাদনের ২৩.১ শতাংশ। সংরক্ষিত আলুর ৭৩.৮ শতাংশ (৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন) এখনও হিমাগারে মজুত রয়েছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চলতি বছর দেশে এক কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৪০২টি হিমাগার ও ৭০৩টি অ-হিমায়িত মডেল ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৭ টন। এর মধ্যে ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৮ টন খাবার ও ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টন বীজ আলু।

রংপুর মহানগরের কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায় দুটি হিমাগারে ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন। বর্তমানে হিমাগার গেটে যে দামে আলু বিক্রি হচ্ছে তাতে কেজিতে সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা লোকসান হবে বলে আপাতত বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর মতো ২০-২৫ জন আলুচাষি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে যে দামে আলু বিক্রি হচ্ছে তাতে নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম হয়েছেন চাষিরা। 

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলায় ৪২টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ টন খাবার ও বীজ আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত দুই বছর থেকে আলুতে কৃষকের লোকসান হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে চাষিরা পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করছেন না। উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, শুধু আলু না করে কিছু জমিতে ভুট্টা, সবজি, ধান চাষ করার।’