কৃষি খবর ডেস্ক: মোবাইল ফোনের কল্যাণে এখন ঘরে বসেই শহরের সবজির বাজারদর সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন গ্রামের কৃষকেরা। এতে উৎপাদিত সবজি বিক্রির আগে সম্ভাব্য দাম জানতে পারছেন তাঁরা। ফলে বাড়ছে দর-কষাকষির সুযোগ। তবে শেষ পর্যন্ত সবজির দাম নির্ভর করছে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সবজির বাজার বগুড়ার মহাস্থানে কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। তাঁদের মতে, মোবাইল ফোনে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাজার পরিস্থিতি বোঝা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে।

বগুড়া সদর উপজেলার রহমতবালা গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম এক একর জমিতে মূলা, লাউ, কুমড়া ও বরবটি চাষ করেছেন। গত ২ অক্টোবর মহাস্থান বাজারে মূলা নিয়ে এসে তিনি জানান, তিন দিন আগেও প্রতি মণ মূলার দাম ছিল প্রায় এক হাজার টাকা। কিন্তু সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে দাঁড়িয়েছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। গরম আবহাওয়ায় উৎপাদিত সবজির মানেও কখনো কখনো প্রভাব পড়ে বলে জানান তিনি।

আমিনুল ইসলামের মতে, কৃষকেরা একজোট হয়ে দাম নির্ধারণ করতে না পারলেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাজারের তথ্য সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে তাঁরা পণ্যের দাম সম্পর্কে আগাম ধারণা পাচ্ছেন।

একইভাবে শিবগঞ্জের উথলী গ্রামের কৃষক রাব্বি মোল্লা আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন প্রায় ৫০ শতক জমিতে। ক্ষেত থেকে সবজি সংগ্রহের আগে অন্য কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য দাম জেনে নেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ঢাকা ও অন্যান্য শহরে সবজির চাহিদা বাড়লে পাইকারেরা কৃষকদের ভালো দাম দিতে আগ্রহী হন। তবে বাজারদর ওঠানামা করায় সব সময় প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যায় না।

মহাস্থান বাজারের ব্যবসায়ীরাও মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভর করছেন। শিবগঞ্জের বিচোক গ্রামের ব্যবসায়ী মাসুম ইসলাম জানান, তিনি কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ করলা এক হাজার ৬০০ টাকায় কিনে এক হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রির আশা করছেন। তবে শহরের পাইকারদের চাহিদা, ক্রেতাদের অর্ডার এবং বাজারে সবজির সরবরাহের ওপর তাঁদের কেনাবেচা নির্ভর করে।

বগুড়ার লাহিড়ীপাড়ার পাইকারি ব্যবসায়ী আবদুল হামিদ প্রামাণিক প্রায় এক দশক ধরে সবজির ব্যবসা করছেন। তাঁর মতে, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখন মোবাইল ফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের খবর রাখছেন। এতে বাজারে দাম বাড়লে কৃষকেরাও সেই বাড়তি দামের একটি অংশ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

মহাস্থান বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সবজি সরবরাহ করা হয়। বাজারটিতে প্রায় ২০০ জন পাইকার ও ৭০ জন পাইকারি আড়তদার রয়েছেন। তাঁদের একজন আল-মামুন। তাঁর মতে, কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার কৃষিপণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে। ফলে কৃষকের বিক্রয়মূল্য ও পাইকারি দামের ব্যবধান কমে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে দাম বাড়লে তার প্রভাব ভোক্তাদের ওপরও পড়ে।

ঢাকার মিরপুরের একটি পাইকারি আড়তের প্রতিনিধি হিসেবে মহাস্থানে কাজ করেন হেফজুল বারী ফকির। তিনি জানান, প্রতিদিন সকালে ঢাকার বাজার থেকে সবজির চাহিদা ও সম্ভাব্য দামের তথ্য পান। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সবজি কিনে ঢাকায় পাঠান। তবে সরবরাহের পরিমাণ ও বাজার পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় নির্ধারিত দামে সবজি কেনা সম্ভব হয় না।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই উৎপাদিত সবজির প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। সবজি দ্রুত পচনশীল হওয়ায় সময়মতো বিক্রি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত বাজারদর জানতে পারলে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে এবং সবজির অপচয় কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে মোবাইল ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, কৃষিপণ্যের বাজার সম্পর্কে তথ্য পাওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তবে কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে বাজারের স্বচ্ছতা, পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সংরক্ষণসুবিধা বাড়ানোও জরুরি।