জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: বাংলাদেশে আগাম বন্যা, তাপপ্রবাহ, খরা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, ফসলহানিসহ প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। এসব দুর্যোগে আগের তুলনায় মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা কমছে। মূলত দুর্যোগ প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা এবং পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম (এএ) জোরদার করায় এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে সেভ দ্যা চিলড্রেনের সুরক্ষা কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, এমপি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় কাজ করা সকল এনজিওগুলোর সঙ্গে সরকার বসতে চায়। কেননা আমাদের দেশে অনেক এনজিও প্রায় একই ধরনের কাজ করে। এতে কোনো কোনো কাজ ওভারলেপিং হয়ে যায়। আর সরকারও জানে না কে কী কাজ করছে। তাতে করে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়।
তিনি বলেন, কাজ করতে হলে টাকার দরকার। এনজিওগুলো কাজের জন্য অর্থায়ন চায় ও আমরাও অর্থায়ন করে থাকি। তাই সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠী ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, ভারী বৃষ্টিপাত এবং অন্যান্য জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপদের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে করে বাস্তুচ্যুতি, জীবিকাহানি এবং সুরক্ষা ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে, বিশেষ করে শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য।
আরো জানানো হয়, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট স্থানচ্যুতির জন্য পূর্বপ্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ বিষয়ক পূর্ববর্তী ডিজি ইকো-অর্থায়িত উদ্যোগে শিক্ষা ও সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং এর অংশীদাররা ‘সুরক্ষা–স্কেলিং আপ মাল্টি-হ্যাজার্ড অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন’-এর মাধ্যমে এই পদ্ধতিকে আরও বিস্তৃত করছে।
এ লক্ষে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ির নির্বাচিত এলাকাগুলোতে জুন ২০২৬ থেকে মে ২০২৮ পর্যন্ত বাস্তবায়িত 'সুরক্ষা' প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নত পূর্বাভাস, অন্তর্ভুক্তিমূলক আগাম সতর্কতা, প্রস্তুতি এবং পূর্বানুমানমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে বহুবিধ বিপদের ঝুঁকি অনুধাবন ও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে জনগোষ্ঠী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা জোরদার করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১০০ পরিবারের মধ্যে জরিপে দেখা গেছে, ৩৮% মানুষ সরাসরি ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পেয়েছে ৬২% মাইকিং এর মতো সেকেন্ডারি চ্যানেলে মেসেজ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮১.১% সতর্ক ব্যক্তিরা প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে ৭৭.৬%-এর কোনও ফলাফল পাওয়া যায়নি৷ ৮০.৫% মেসেজ প্রাপকের জন্য ১-৩ দিনের অগ্রিম সময় ছিল, ৫,০০০ টাকার প্রত্যাশিত নগদ সহায়তার ফলে প্রতিটি অর্জিত সম্পদ ২ ডলারের ক্ষতি এড়াতে পেরেছে, যা পারিবারিক আয়ের প্রায় দুই মাসের সমপরিমাণ সম্পদ রক্ষা করেছে।
দূরবর্তী অঞ্চলের ঝুঁকি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৪৪.৮% উত্তরদাতা দুর্যোগকালীন সময়ে মারাত্মক মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানিয়েছে।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ভূমিধস, বাড়ি-ঘর ধ্বংস ও কৃষি ফসলের ক্ষতি হয়। তাই আগাম সতর্কবার্তা পেলে কী ধরনের ফসলের আবাদ করে সে বিষয় কৃষকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সেভ দ্যা চিলড্রেনের চট্টগ্রাম অফিসের প্রধান গোলাম মোস্তফা বলেন, আমরা আগেও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে কাজ করেছি। প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। যাদের মধ্যে ৬০ শতাংশ শিশু।
ফাতেমা মেহেরুন্নেসা বলেন, ২০২৪-২৬ সাল পর্যন্ত আর্লি ওয়ার্নিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম সেশনে ৪০ হাজার মানুষ নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে দেড় লাখ মানুষ নিয়ে কাজ করা হবে।
আবহাওয়াবিদ কামরুল হাসান বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সচেতন করা ও শিক্ষিত করা। কেননা একই ধরনের বৃষ্টিপাতে সব জায়গায় ভূমিধস হয় না। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে পর্যাপ্ত মনিটরিং সিস্টেমে আনা যায়নি। এ জন্য আধুনিক আরো স্টেশন স্থাপন দরকার। তা ছাড়া কমিউনিটি বেইজড ভলান্টিয়ার তৈরিতে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।
তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর কৃষি চাষ করা হয়। তা ছাড়া অনেক ধরনের ফলের আবাদ হয়। ফলে সেখানে আর্লি ওয়ার্নিং অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে মানুষের মৃত্যুর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে কাজ করা হচ্ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, অধিদপ্তর ৫ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ৫ দিনের তথ্য প্রদান করে আসছে যা ৯০-৯৫ শতাংশ কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। এসব পূর্বাভাসের ফলে দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি নেওয়া ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমে আসছে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষরা এমনভাবে বাড়ি-ঘর তৈরি করেন যেখানে খুব কম ধ্বস হয়। অপরদিকে যারা বাইরে থেকে সেখানে গিয়ে বাড়ি করে তাদের ঘরগুলো বেশি ভাঙে। তিনি বলেন, বান্দরবনে ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাতিসত্তার বসবাস। অন্যান্য অঞ্চলের জাতিসত্তার ভাষাও আমরা অনুবাদ করেছি।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস ও নতুন নতুন দুর্যোগ বাড়ছে বলে জানান এনজিও ব্যুরোর মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জকরিয়া।
সেভ দ্যা চিলড্রেনের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর এস এম রহমাতুল্লাহ বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে সুরক্ষা প্রকল্পটি কাজ করবে। আমরা স্থানীয়দের সঙ্গে তিনি প্রকল্পটি আরো বিশদভাবে সাজাবো।






