কৃষি খবর ডেস্ক: যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটের মধ্যে ইয়েমেনের হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে উঠেছে খেজুর। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় হাদরামাউত প্রদেশের হাজর জেলায় খেজুর চাষ ও বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন বহু কৃষক। পরিবারের খাবার জোগাড় থেকে শুরু করে সারা বছরের ঋণ পরিশোধ—সবকিছুই নির্ভর করছে এই ফসলের ওপর।

ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের সংঘাতের পাশাপাশি ২০২৬ সালের অক্টোবরে নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে নতুন করে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে হাজরের কৃষকদের কাছে খেজুর শুধু আয়ের উৎস নয়, খাদ্যসংকট মোকাবিলারও অন্যতম ভরসা।

প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই খেজুর শুকানো ও পরিষ্কারের কাজে মাঠে নেমে পড়েন কৃষক নাবিল আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। খেজুর বিক্রি করেই চলে তাঁদের সংসার। কিছু ফল বিক্রি করেন, আর কিছু রেখে দেন পরিবারের খাবারের জন্য।

নাবিল বলেন, ‘এটাই আমার আয়ের একমাত্র উৎস।’ তাঁর ভাষ্য, কিছু পরিবার মাছ ও ভাত কেনার সামর্থ্য না থাকায় খেজুর ও কফি খেয়েই দিন পার করে।

চার সন্তানের বাবা রাশেদ মোহাম্মদের অবস্থাও সংকটাপন্ন। স্থানীয় মুদি দোকানে তাঁর ১০ লাখ ইয়েমেনি রিয়াল ঋণ রয়েছে। খেজুর বিক্রি করতে না পারলে এই ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না। ক্রেতার অপেক্ষায় অনেক কৃষক রাতেও খোলা মাঠে খেজুরপাতার তৈরি অস্থায়ী ছাউনিতে থাকেন।

তবে যুদ্ধের পাশাপাশি পানির সংকটও কৃষকদের বিপাকে ফেলেছে। কয়েক মাস আগে বন্যায় একটি ছোট বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খেজুরবাগানে পানির সরবরাহ কমে গেছে। এতে অনেক গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে, কমছে উৎপাদন। স্থানীয় কৃষক কমিটির প্রধান আওয়াধ মুবারক জানান, পরিস্থিতির চাপে অনেক কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

কৃষকেরা বলছেন, পরিবহন খরচের অভাবে তাঁদের পক্ষে বড় বাজারে খেজুর নিয়ে যাওয়া কঠিন। তাই তাঁরা সরকার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে খেজুর প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং কারখানা স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, হাজরে অন্তত ২০ লাখ খেজুরগাছ রয়েছে। এখানকার খেজুর কিনতে দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারাও আসেন। তাঁদের একজন ওমর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার ঘরে খেজুর থাকলে আমি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকি।’

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইয়েমেনে ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছেন। একই বছর দেশটিতে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ)।

যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে হাজরের কৃষকদের কাছে খেজুর তাই কেবল একটি ফসল নয়; এটি পরিবারের খাবার, ঋণ পরিশোধের আশা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার অবলম্বন। তবে এই জীবিকা টিকিয়ে রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পুনর্নির্মাণ, পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ সহজ করা জরুরি।

সূত্র: আল জাজিরা