জেলা প্রতিনিধি পাবনা: পাবনার চাটমোহর উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের হোগলবাড়িয়া গ্রামের নারী উদ্যোক্তা শারমিন খাতুন। মাঠে যার ছিলো কেবল শূন্যতা, ছিলো না পা ফেলার নিজস্ব জায়গাটুকুও। অথচ তিনিই হয়ে উঠেছেন মাঠের রানী। অদম্য ইচ্ছা, শ্রম আর বুকভরা সাহসে লিজ নেওয়া মাত্র দুই বিঘা জমিতে মাল্টা চাষ করেই বাজিমাত করেছেন এই গৃহবধূ। ব্যাপক ফলনে চলতি বছরেই তাঁর ঝুলিতে আসতে যাচ্ছে লাভের প্রায় চার লাখ টাকা। অনাবাদী জমিতে মাল্টা চাষের এই অভাবনীয় সাফল্য তাকে এনে দিয়েছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, একই সাথে বদলে দিয়েছে জীবনের চেনা গল্পও। অভাবনীয় সাফল্যের এই গল্পে উপজেলাজুড়ে তার খ্যাতি এখন ‘মাল্টা ভাবি’।

সম্প্রতি চাটমোহর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে শারমিন খাতুনের বাগানে গিয়ে দেখা যায় এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। সারি সারি গাছের থোকায় থোকায় ঝুলে আছে সবুজ বর্ণের মাল্টা। ফলের ভারে প্রতিটি গাছের ডালপালা একদম নুয়ে পড়েছে। বাগানের এই মাল্টা সাইজ, রসালো ভাব ও স্বাদের দিক থেকে বাজারের আমদানিকৃত বিদেশি ফলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। স্থানীয় বাজারে শারমিনের উৎপাদিত ফল বেশ দাপটের সাথেই টেক্কা দিচ্ছে বিদেশি মাল্টাকে।

চ্যালেঞ্জ জয় ও সাফল্যের সূচনা

গল্পটার শুরু ২০২৩ সালের শেষের দিকে। করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে তরুণ ও অন্যান্য উদ্যোক্তারা যখন কৃষিতে নতুন ভবিষ্যৎ খুঁজছিলেন, শারমিনও তখন ঘরে বসে না থেকে কৃষিতে আত্মনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। তবে গতানুগতিক ফসলের পেছনে না ছুটে তিনি বেছে নেন কিছুটা ব্যতিক্রমী ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ। পাঁচ বছরের জন্য লিজ নেওয়া ২ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেন ভিয়েতনামী ও বারি-১ জাতের মাল্টার বাগান।

শুরুর প্রথম দুই বছর খুব বেশি ফল নেওয়া হয়নি। কিন্তু নিবিড় পরিচর্যা ও নিয়মিত তদারকিতে গত বছর বাগান ভরে ওঠে ফলে ফলে। জমির লিজ খরচ এবং সব ধরনের পরিচর্যা ব্যয় মিটিয়ে প্রথম বছরেই তাঁর ২ লক্ষাধিক টাকা লাভের মিখ দেখেন। এ বছর ফলন আরো বেড়েছে। তাই তো শারমিন খাতুন আশা করছেন, এবার সব খরচ বাদ দিয়ে অন্তত ৪ লাখ টাকা লাভের।

কটাক্ষ পেরিয়ে ‘মাল্টা ভাবি’ পরিচিতি

গ্রামের একদম শেষ মাথায় রেললাইনের ধারের একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাগান হওয়ায় যাতায়াতের বেশ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবুও প্রতিদিন বহু মানুষ ভিড় করছেন শারমিনের বাগান দেখতে। কেউ আসছেন মাল্টা কেনার জন্য, কেউ বা দেখতে ও জানতে এসেছেন চাষের আধুনিক কৌশল।

তেমনই একজন মো. হালিম। পাশ্ববর্তী গ্রাম থেকে  এসেছেন জানিয়ে বাগান সম্পর্কে হালিম জানান, ওই পাশের গ্রামে একটি কাজে আসছিলাম। এদিক দিয়েই যাওয়া। এই মাল্টা ভাবির নাম শুনি শুধু। ভাবলাম, দেখি বাগানের কি অবস্থা। তাতে মাল্টা দেখে একটু অবাকই হলাম। গাছে তো অনেক মাল্টা। আবার যে লাভের কথা বলতেছে, তেমন হলে তো বাগান করাই ভালো। তবে পেরে উঠবো কি না সে নিয়েও ভাবতে হবে। সবার তো আবার বাগান হয় না।

বাগান দেখে ফিরছিলেন তরুণ হাসান করিম। তিনি জানান, প্রত্যেকটি সফলতার পেছনে ব্যাপক শ্রম, ঘাম ও ধৈর্য্যের গল্প থাকে। মাল্টা ভাবি সেই গল্প রচনা করতে পেরেছেন। তাই হয়তো আজ তাকে ও তার বাগান দেখতে আসতে হলো। আমরা তরুণরা চাকুরী ছাড়া কিছু বুঝতেই চাই না, অথচ এভাবেও কিন্তু সফল হওয়া যায়। সেই সাহস নিয়ে শুরু করার মানসিকতাটা গড়ে উঠছে না। শুধু চাকুরীর পেছনে না ছুটে এরকম উদ্যোক্তা হবার চেষ্টাও আমাদের থাকা উচিত।

এবার নিজের লড়াইয়ের গল্প জানতে চাওয়া হয় শারমিন খাতুনের কাছে। বাগান ঘুরে ঘুরে গল্পে শোনাতে গিয়ে জানালেন, শুরুর দিকে লিজের জমিতে ফল বাগান করা নিয়ে আশেপাশের অনেকেই অনেক কটাক্ষ করেছিল। কারণ যে জমিতে সাধারণ ফসল চাষ করে লাভ করা দুঃস্বপ্ন ছিল, সেখানে মাল্টা চাষ করা ছিল বড় ঝুঁকি। তবে তিনি দমে যাননি। তিনি বলেন, গত বছর ভালো লাভ করার পর এবার ৪ লাখ টাকা লাভের আশা করছি। বাগানের সবুজ মাল্টা দেখতে সুন্দর হলেও হলুদ জাতের মাল্টার মতো দাম একটু কম পাওয়া যায়। তাই বাজারের প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থান নিতে নতুন করে আরও ১ বিঘা জমিতে অস্ট্রেলিয়ান হলুদ জাতের মাল্টার চারা লাগিয়েছি। তিনি আরও জানান, কষ্টের ফলে যখন ঝুড়ি ভরা দেখা যায় এবং বাজারে ভালো দাম ও কদর পাওয়া যায়, তখন সব ক্লান্তি মুছে যায়। আর সবাই ভালোবেসে ‘মাল্টা ভাবি’ বলে ডাকে তখন আরো ভালো লাগে।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আশ্বাস শারমিন খাতুনের এই বাণিজ্যিক সাফল্যে কারিগরি সহায়তা নিয়ে পাশে রয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। উপজেলার কামালপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, বাগান গড়ে ওঠার খবর পাওয়ার পর থেকেই শারমিন খাতুনকে কৃষি বিভাগ নিয়মিত তদারকি করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। পরবর্তীতে উপজেলা পর্যায় থেকে শারমিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভিয়েতনামী জাতের মাল্টা বছরের অধিকাংশ সময়ই ফলন দেয়। এর মিষ্টতা ও রসের পরিমাণ অন্য যেকোনো জাতের চেয়ে বেশি হওয়ায় চাষিরা বাজারে দ্রুত ও ভালো দাম পান।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা ঘোষ জানান, শারমিন খাতুনের মতো সাহসী উদ্যোগ চাটমোহর উপজেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। উপজেলা ফল মেলায় শারমিনের বাগানের মাল্টা প্রদর্শন করার পর তা দেখে এলাকার বহু সাধারণ কৃষক এখন মাল্টা চাষে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। কৃষকদের মাঝে এ চাষের বিস্তার লাভে কৃষি বিভাগ সকলকে সহযোগিতা করবে।