কৃষি খবর ডেস্ক: কৃষকেরা কঠর পরিম্রম করেও পাচ্চেনা ফসলের ন্যায্য মূল্য। এর সুবিধা পুরোটাই নিচ্ছে মধ্যস্বত্ত্ব ভোগীরা। বগুড়ার মাঠে কৃষক যে পটল বিক্রি করছেন ৩০ টাকায়, মহাস্থান হাটে সেটিই উঠছে ৪০ টাকায়। শহরের ফতেহ আলী বাজারে গিয়ে সেই পটলের দাম দাঁড়াচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। শসার ক্ষেত্রেও একই চিত্র—কৃষকের ৩০-৩৫ টাকার পণ্য শহরে বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়। অথচ গত সাত দিনে মহাস্থান হাটে পটল, করলা, ফুলকপি, মুলাসহ বিভিন্ন সবজির দাম কমেছে।

কৃষক থেকে শহরের ক্রেতার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পরিবহন, শ্রমিক, খাজনা, বাছাই, পচন ও ব্যবসায়ীর লাভ—বিভিন্ন খরচ যুক্ত হওয়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। তবে পরিবহন ব্যয়ের হিসাব বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ভাড়া বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে তার প্রভাব কেজিতে এক টাকারও কম। ফলে হাটে দাম কমার পরও শহরের বাজারে একই হারে না কমার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মহাস্থান হাটে গত সাত দিনে পটলের দাম ৪০ টাকা থেকে কমে ২৫-৩০ টাকা হয়েছে। করলা ৫৫ থেকে কমে ৪৫, ফুলকপি ৭০-৮০ থেকে ৬০ এবং মুলা ৩৫ থেকে ২২ টাকা হয়েছে। লেবু ৩০ টাকা থেকে কমে ২০ টাকা হালি হয়েছে। অন্যদিকে ফতেহ আলী বাজারে সোমবার পটল ৫০-৬০, করলা ৮০ এবং ফুলকপি ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

হাটে কৃষকের কাছ থেকে পটল কেনার সময়ও দামের বড় পার্থক্য দেখা যায়। কৃষক ৩০ টাকা পেলেও মহাস্থানে পাইকারি দর হচ্ছে ৪০ টাকা। এরপর শহরের বাজারে তা আরও ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাচ্ছে। শসার ক্ষেত্রেও কৃষক ৩০-৩৫ টাকা পেলেও মহাস্থানে দর ৪০ টাকা এবং ফতেহ আলীতে ৫০-৬০ টাকা।

ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চালক ও ব্যবসায়ীরা। তবে বাড়তি ভাড়াকে কেজিপ্রতি হিসাব করলে অঙ্কটি খুব বেশি নয়।

ট্রাকচালক শফিকুর রহমান বলেন, বগুড়া-টাঙ্গাইল রুটে ভাড়া আগে ছিল ৮ হাজার টাকা। এখন ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা। তাঁর ট্রাকে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার কেজি পণ্য যায়। ফলে ১ হাজার টাকা ভাড়া বাড়লেও প্রতি কেজিতে বাড়তি খরচ পড়ে প্রায় ২০ পয়সা।

মহাস্থান থেকে শহরে সবজি আনতেও ভাড়া বেড়েছে। ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম জানান, আগে ভ্যানভাড়া ছিল ১৫০ টাকা, এখন ২৫০ টাকা। একটি ভ্যানে ১৬০ থেকে ২০০ কেজি সবজি ওঠে। ফলে বাড়তি ১০০ টাকা ভাড়ার প্রভাব কেজিতে প্রায় ৫০ থেকে ৬৩ পয়সা।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ৪০ কেজির এক মণের জায়গায় অনেক সময় ৪২ থেকে ৪৩ কেজি সবজি দিতে হয়। দূরের বাজারে নেওয়ার পথে পচন ও ওজন কমার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এই বাড়তি সবজি নেওয়া হয় বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ৪০ কেজি পটল ৩০ টাকা দরে বিক্রি করলে দাম হয় ১ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু একই টাকা পেতে ৪২ কেজি দিতে হলে কার্যকর দর দাঁড়ায় কেজিতে ২৮ টাকা ৫৭ পয়সা। ৪৩ কেজি দিলে তা নেমে আসে ২৭ টাকা ৯১ পয়সায়। এর সঙ্গে খাজনাও দিতে হয়।

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, পটল কৃষকের কাছ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে কেনার পর শহরে ৫০-৬০ টাকা হলেও মহাস্থান থেকে শহরে আনার বাড়তি ভাড়া কেজিতে এক টাকার মতো। দূরের রুটে বাড়তি ট্রাকভাড়াও অনেক ক্ষেত্রে কেজিতে এক টাকা ছাড়াচ্ছে না। তাই ২০-৩০ টাকা দামের ব্যবধানের পুরোটা শুধু তেলের দাম বা পরিবহন ব্যয় দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। শ্রমিক, খাজনা, পচন, ওজন ঘাটতি, বাছাই ও ব্যবসায়ীর লাভ প্রতিটি খাতে কত টাকা যাচ্ছে, তার হিসাব স্পষ্ট হওয়া দরকার।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বগুড়ার সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব পণ্যের দামে পড়তে পারে। তবে তেলের দাম বা পরিবহন ব্যয় বাড়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারেন না।