কৃষি খবর ডেস্ক: নাটোরের চলনবিল অঞ্চলে রং বিলাস আখ এখন কৃষকের জন্য সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসলে পরিণত হচ্ছে। উজ্জ্বল রং, রসালো কাণ্ড এবং চিবিয়ে খাওয়ার আখ হিসেবে ব্যাপক চাহিদার কারণে দিন দিন এই জাতের আবাদ বাড়ছে।
জেলার তিনটি উপজেলায় কৃষকেরা ভালো ফলন ও লাভের আশায় রং বিলাস আখ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। চলতি মৌসুমে নাটোরে ১২৬ হেক্টর জমিতে রং বিলাস আখ চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ১ হাজার ২১৩ টন আখের রস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রং বিলাস আখ চাষে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে গুরুদাসপুর উপজেলা। সেখানে ৬০ হেক্টর জমিতে এই আখ চাষ হয়েছে। এরপর বড়াইগ্রামে ৫২ হেক্টর এবং সিংড়ায় ১৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।
মজার বিষয় হলো, নাটোরে রং বিলাস আখের আবাদ মূলত চলনবিলসংলগ্ন এই তিন উপজেলাতেই সীমাবদ্ধ। মাটি, পানির প্রাপ্যতা ও আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশ এই জাতের আখ চাষের জন্য বেশ উপযোগী বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকদের মতে, রং বিলাস আখের সবচেয়ে বড় সুবিধা শুধু আখ বিক্রি নয়। আখের সারির মাঝের জমিতে রসুন, পেঁয়াজ ও মুগডালের মতো ফসল চাষ করা যায়। ফলে একই জমি থেকে বাড়তি আয় করা সম্ভব হয়।
কৃষক রাবিউল করিম বলেন, আখের চারা লাগানোর পর তিনি জমির ফাঁকা জায়গায় রসুন বা পেঁয়াজ চাষ করেন।
তিনি জানান, প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মণ রসুন পাওয়া যায়। আর পেঁয়াজের ফলন ৬০ মণ পর্যন্ত হতে পারে।
তার মতে, আখের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে রসুন বা পেঁয়াজ চাষ করে যে আয় হয়, তা দিয়ে প্রায় পুরো আখ চাষের খরচ উঠে আসে। ফলে আখ বিক্রি করে পাওয়া অর্থের বড় অংশই লাভ হিসেবে থাকে।
রাবিউল করিম বলেন, সাথি ফসল চাষ করতে পারলে একজন কৃষক প্রতি বিঘা জমি থেকে অন্তত ২ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারেন।
বড়াইগ্রামের মহিষভাঙ্গা গ্রামের কৃষক গোলাম রাসুলের কাছে রং বিলাস আখ শুধু মৌসুমি ফসল নয়। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি এই জাতের আখ চাষ করছেন।
আগামী মৌসুমের জন্য তার নার্সারিতে ইতোমধ্যে ১ হাজারের বেশি চারা প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি জানান, রং বিলাস আখ সারা বছর জমিতে থাকে এবং নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।
গোলাম রাসুল বলেন, বিশেষ করে ছত্রাকের আক্রমণ থেকে আখগাছকে রক্ষা করতে নিয়মিত যত্ন নিতে হয়। সঠিকভাবে পরিচর্যা করা গেলে ফলনও ভালো পাওয়া যায়।
চলতি মৌসুমে তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে রং বিলাস আখ চাষ করেছেন। এরই মধ্যে দুই বিঘা জমির আখ ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।
নাটোরের বাইরের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরাও সরাসরি তার জমিতে এসে আখ কিনছেন। তিনি প্রতি ১০০টি আখ ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। আকার ও মান অনুযায়ী খুচরা বাজারে প্রতিটি আখ ৪০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
বনপাড়া কৃষি ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, কৃষকেরা আখের জমিতে রসুন ও পেঁয়াজের পাশাপাশি মুগডালও চাষ করছেন।
তিনি বলেন, সাথি ফসল চাষের কারণে রং বিলাস আখ অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে কৃষকেরা একই জমি থেকে উল্লেখযোগ্য বাড়তি আয় করতে পারেন।
চলতি মৌসুমে তার কৃষি ব্লকে প্রায় ১০০ একর জমিতে রং বিলাস আখ চাষ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বড়াইগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলিমা জাহান বলেন, রং বিলাস আখ চাষ এলাকার কৃষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে ভূমিকা রাখছে।
এই জাতের আখের আবাদ আরও বাড়াতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম রফিউল ইসলাম বলেন, বর্তমানে নাটোর জেলায় রং বিলাস আখ চাষে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে গুরুদাসপুর।
লাভজনক হওয়ায় উপজেলার অনেক আগ্রহী কৃষক আখ চাষে যুক্ত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, চলনবিল এলাকার কৃষকেরা ইতোমধ্যে রং বিলাস আখ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই জাতের চিবিয়ে খাওয়ার আখ ধীরে ধীরে চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলে পরিণত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এটি এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ফসল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভালো বাজার চাহিদা, আকর্ষণীয় দাম এবং আখের সঙ্গে লাভজনক সাথি ফসল চাষের সুযোগ—সব মিলিয়ে রং বিলাস আখ নাটোরের চলনবিল এলাকার কৃষকদের জন্য সারা বছর আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।




