কৃষি খবর ডেস্ক: কৃষক জীর্ণ হলে, দুর্বল হলে, মাটি চিরে ফসল উৎপাদন করবে কীভাবে? তাকে তো শক্তিমান হতে হবে। এ কারণে কৃষককে বাস্তবে যা দেখছেন, তার চেয়ে বেশি শক্তিমান হিসেবে তুলে ধরেছেন সুলতান। কৃষকের পেশিবহুল শরীর, শক্ত হাতে লাঙ্গল ধরা, কঠোর পরিশ্রমে ঘামে ভেজা শরীর- কৃষকের শ্রম ও শক্তিকে এভাবেই দেখেছিলেন এস এম সুলতান।

আজ ১০ অক্টোবর এস এম সুলতানের মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে নড়াইল জেলা প্রশাসন।

রোদবৃষ্টির সাথে নিত্য যাদের লড়াই, লাঙলের ফলার আঘাতে যারা কঠিন মাটির বুকে জাগায় সবুজ-শ্যামলীমার নৃত্য তারাই তো সভ্যতার প্রকৃত কারিগর। তারা কোনো হাড়জিরজিরে রোগশোকে ভোগা শরীর নিয়ে জীর্ণ জীবনযাপন করবে! এই প্রশ্নটিকে জীবনে ধারণ করে যে শিল্পীর জীবনদর্শন একটি ভিন্ন আঙ্গিক রচনা করেছিল তৎকালীন শিল্পধারায় তিনি শিল্পী এস এম সুলতান। পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। তিনি ছিলেন প্রকৃত মানবিকতার শিল্পী যার চিত্রপটে কৃষকসমাজের জীবনধারা একটি নব্যদর্শনের জন্ম দিয়েছিল।

কৃষকের বুকের পাঁজর ক’খানা গুনবার জোগাড় হয় কার্তিক মাসের আকালে। অপুষ্টি আর রোগশোকের সে শরীর নিয়ে তারা মাটির সাথে লড়াই করে চলে, বাঁচার লড়াই, টিকে থাকার লড়াই। এই রূঢ় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে শিল্পী এস এম সুলতানের চোখে ভাসে ভিন্ন এক ছবি। ক্ষয়ে যাওয়া এই সমাজসভ্যতাকে তিনি পুনরায় শুরু থেকে শুরু করবার স্বপ্ন দেখলেন এবং রংতুলির ভাষায় তা ফুটিয়ে তুলতে শুরু করলেন ক্যানভাসে।

তিনি আঁকলেন পৃথিবীর আদিপুরুষ আদমের ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’। এই চিত্রটিতে দেখা যায় সুগঠিত পুষ্ট পেশিবহুল দেহের আদম তার দৃপ্ত হাতে একটি বৃক্ষরোপণ করতে উদ্যত। যেন এই চারারোপনের মধ্যদিয়ে সভ্যতার এক পুনঃ ও নব্য সূচনা হচ্ছে যেখানে গ্রামের খেটেখাওয়া সাধারণ কৃষকরাই হবে সকল ক্ষমতার উৎস। তারা যে ফসল ফলাবে তার পূর্ণ অধিকার থাকবে তাদেরই হাতে। তাদের শরীর হবে পুষ্ট পেশিবহুল। কারণ, তাদের কায়িক শ্রমেই ভরেওঠে ফসলের মাঠ।

গ্রামীণ জীবনে যেমন নিসর্গের মাঝে বুকভরে শ্বাস নেবার আনন্দ আছে তেমনি এ জীবন কঠোর পরিশ্রমের। গ্রামীণ প্রতিটি কাজেই লাগে পেশিশক্তির ব্যবহার—জমি কর্ষণ, ফসল মাড়াই, ঢেঁকিতে ধান ভানা, নৌকা বাওয়া, মাছ ধরা কোনোটিই কায়িক শ্রম ব্যতীত সম্ভব নয়। তারপর আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর চর দখলের মতো জীবন সংগ্রাম। তবুও দিনশেষে কৃষকের নিজহাতে বোনা ধান কৃষাণির পায়ের বলে ঢেঁকিতে ভানা হয়ে যে চাল হলো তার ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর বিলঝিল পুকুরের মাছ, গাভির দুধ—সবমিলে পুষ্ট হবে কৃষকের শরীর।

এস এম সুলতানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নড়াইল জেলা প্রশাসন, সুলতান ফাউন্ডেশন, এস এম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, সমাধি জিয়ারত, কোরআনখানি, মিলাদ মাহফিল, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও আলোচনাসভা।

১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল পৌরসভার মাছিমদিয়া গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এস এম সুলতান। তার ডাক নাম ছিল লাল মিয়া। জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তি হয়ে ওঠা সুলতান প্রথম এশীয়, যার আঁকা ছবি পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালির মতো বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের চিত্রকর্মের সঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে। 

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সুলতান। গ্রামে নিজ বাড়ির আঙিনায় চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন এই শিল্পী।