কৃষি খবর ডেস্ক: দেশে বর্ষা মৌসুম ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার ধাক্কায় কৃষি খাতে বড় ধরনের সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সংস্থাটির 'ডেটা ইন ইমার্জেন্সিস মনিটরিং' (ডিআইইএম)-এর ১৪তম ধাপের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে নভেম্বর সময়কালে দেশের প্রায় ১০ লাখ কৃষি পরিবার, যার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ জরুরি কৃষি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার মুখে রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ১৩তম ধাপের জরিপে জরুরি সহায়তার প্রয়োজন ছিল প্রায় ৮ লাখ কৃষি পরিবারের। এক বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা বেড়েছে আরও ২ লাখ।

সিলেট ও রংপুরে সংকটের হার বেশি : এফএও-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট কৃষি পরিবারের মধ্যে জরুরি সহায়তার অনুপাতের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে সিলেট (৭ শতাংশ), রংপুর (৬ শতাংশ) ও ময়মনসিংহ (৫ শতাংশ) বিভাগ। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রকৃত সংখ্যার হিসাবে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম (১ লাখ ৮৭ হাজার) ও রংপুর বিভাগ (১ লাখ ৬২ হাজার)। এর পরপরই রয়েছে ঢাকা (১ লাখ ৫৭ হাজার), রাজশাহী (১ লাখ ৪২ হাজার), ময়মনসিংহ (১ লাখ ১২ হাজার), খুলনা (১ লাখ ১১ হাজার), সিলেট (৯৫ হাজার) ও বরিশাল (২৭ হাজার)। ঢাকা বিভাগে সাহায্যপ্রার্থী পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে (৫০ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার)। বিশেষ করে নদী অববাহিকা, হাওর অঞ্চল ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর পরিবার বর্ষার তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চরম জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সংকটে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক: বেশি সংকটে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা। জরিপ মতে, জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এমন ৫৭ শতাংশ কৃষি পরিবারের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১ হেক্টরের কম এবং ৬০ শতাংশ পরিবার আর্থিক দিক থেকে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। কৃষিতে অনিয়মিত শ্রম ও দিনমজুরির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে যেকোনো ধাক্কা সামলানো এবং নতুন করে চাষবাসের পুঁজি জোগাড় করা এসব পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যয়ে কাটছাঁট : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৮৪ শতাংশ সাহায্যপ্রার্থী পরিবার অর্থনৈতিক ধাক্কার শিকার হয়েছে এবং ১৬ শতাংশ সরাসরি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে, যা পূর্ববর্তী জরিপের চেয়ে ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। চরম আর্থিক সংকটে পড়ে পরিবারগুলো নানামুখী ক্ষতিকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। প্রায় ৬৭ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে তারা বাকিতে খাদ্য কিনে জীবনধারণ করছে, ৬৬ শতাংশ পরিবার চিকিৎসা বাবদ খরচ কমিয়েছে এবং ৩০ শতাংশ পরিবার বাধ্য হয়ে কৃষির মূল উপকরণ কেনা কমিয়ে দিয়েছে।

উৎপাদন খরচ বাড়ছে, মিলছে না ন্যায্য দাম : একদিকে বাড়তি উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে কীট-পতঙ্গের উপদ্রব, সব মিলিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকেরা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাজারে ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ার সমস্যা। ফলে উৎপাদন করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

এফএওর তথ্য অনুযায়ী, উদ্ভিদের রোগবালাই-সংক্রান্ত সমস্যায় পড়ার হার আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ পয়েন্ট এবং সার পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার হার ১৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। একই সময়ে বাজারে ফসলের কম বিক্রয়মূল্যের কারণে ফসল বিক্রিতে সমস্যায় পড়ার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে এ হার ছিল ৯ শতাংশ, তা একলাফে বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি উপকরণের সংকট এবং বাজারে কম দাম—এই তিনমুখী চাপে কৃষকেরা এখন ফসল উৎপাদন করেও কাঙ্ক্ষিত আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কী ধরনের সহায়তা জরুরি? সামনে আমন চাষের মৌসুম চলায় কৃষকদের সহায়তা তরান্বিত করা আবশ্যক বলে প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে। সাহায্যপ্রার্থী পরিবারগুলোর ৭২ শতাংশই ফসল উৎপাদনের জন্য সারের মতো উপকরণের সহায়তা চেয়েছে। তবে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি দেখা গেছে নগদ অর্থ সহায়তার দাবীতে, যা আগের ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ৫১ শতাংশ পরিবার গবাদি পশুর খাদ্য এবং ৩৩ শতাংশ পশু চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও এফএও-র সুপারিশ অনুযায়ী, আসন্ন আমন মৌসুমের ফসল সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার-বীজ বিতরণের পাশাপাশি নগদ অর্থ সহায়তা, পশু চিকিৎসা ও সেচ-পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলায় গত ২০ এপ্রিল থেকে ২৭ মে ২০২৬ পর্যন্ত ৬,১৪৩টি পরিবারের ওপর টেলিকম সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এফএও এই ১৪তম ধাপের জরিপটি পরিচালনা করে ।

সূত্র: কৃষি কাগজ