জেলা প্রতিনিধি, পাবনা: দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনের শীর্ষ জেলা পাবনায় পেঁয়াজের বীজতলা তৈরীতে রাসায়নিক সার (ডিএপি ও টিএসপি)'র ব্যবহার কমিয়ে ছাই ও গোবর (জৈব সার)'র ব্যবহার শুরু করেছে কৃষক। জমিতে ছাই ও গোবর ব্যবহারে পেঁয়াজের বীজতলা ক্ষতিকর ছত্রাক, থ্রিপস্ পোকা, জাত পোকা ও শোষক পোকার আক্রমণ থেকে যেমন রক্ষা পায় একইসাথে বীজতলার চারার গ্রোথ ভালো ও শেকড় শক্তিশালী হয়।
এছাড়াও কৃষি জমিতে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারে জমির হ্রাস পাওয়া উর্বরতা শক্তি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই জৈব সার (ছাই ও গোবর)। পেঁয়াজের বীজতলায় ছাই ও গোবর ব্যবহারে কৃষক যেমন উপকৃত হচ্ছে, তেমনি ছাই ও গোবর ক্রয়,বিক্রয় ও সরবরাহ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো। কিছুদিন পূর্বেও যে ছাই শুধুমাত্র গর্ত ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হতো সময়ের পরিবর্তনে সেই ছাই এখন কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার আশা জাগানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক পটপরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক গণ।
অগ্রহায়নের শেষ সপ্তাহ থেকে পৌষের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পেঁয়াজ (হালি বা দানা পেঁয়াজ) রোপনের লক্ষ্যে আশ্বিনের শেষ সপ্তাহ থেকে কার্তিকের মাঝামাঝি (জমি থেকে বর্ষার পানি নামা সাপেক্ষে) পর্যন্ত পেঁয়াজের বীজতলা তৈরীর কাজ করে কৃষক। বীজতলা তৈরীর পূর্বেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অটো রাইচ মিল থেকে ছাই সংগ্রহ করে সাঁথিয়া, সুজানগর, ফরিদপুর সহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষন করছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পাবনা জেলার সাঁথিয়া, সুজানগর,ফরিদপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট উপজেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
জানা যায়, পাবনা জেলার মধ্যে সাঁথিয়া উপজেলার সিংহভাগ কৃষকই পেঁয়াজের বীজতলায় ছাই ব্যবহর করে থাকে। এছাড়া পেঁয়াজের রাজধানীখ্যাত সুজানগর, ফরিদপুর ও পাবনা সদরের বিভিন্ন এলাকায় পেঁয়াজের বীজতলা তৈরীতে ছাই ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে সুজানগর উপজেলায় বীজতলা তৈরীতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গোবর।
সাঁথিয়া উপজেলার কল্যানপুর এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন জানান, আমি নিয়মিত পেঁয়াজ আবাদ করি। পেঁয়াজ রোপনের পূর্বে নিজেই বীজতলা তৈরী করি। পেঁয়াজের বীজতলা তৈরীতে ইতিপূর্বে শুধুমাত্র ডিএপি ও টিএসপি সার ব্যবহার করতাম, এখন ছাই ব্যবহার করি। ছাই ব্যবহারে পূর্বের চেয়ে বীজতলায় চারা ভালো হয়।
হুইখালী এলাকার পেঁয়াজ চাষী মোস্তফা বলেন, পেঁয়াজের বীজতলায় ছাই ব্যবহার করলে দ্রুত চারা বৃদ্ধি পায় ও চারার শেকড় মজবুত হয়। এতে পেঁয়াজের ফলন ভালো হয় ও উৎপাদন খরচ কম হয়।
ছাই ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ বলেন, সাঁথিয়া এলাকায় আমিই প্রথম পেঁয়াজের বীজতলায় ছাই ব্যবহার প্রথা চালু করি। পরবর্তীতে অন্যান্য কৃষক আগ্রহী হওয়ায় আমি এলাকায় ছাই সরবরাহ শুরু করি। শেরপুর ও দাশুরিয়ার এলাকার বিভিন্ন অটো রাইচ মিল থেকে আমি ছাই সংগ্রহ (ক্রয়) করে ট্রাকযোগে এলাকায় এনে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেই। প্রতিবস্তা ছাই আমি ৩০-৪০ টাকায় ক্রয় করি, এরসাথে এলাকায় আনতে পরিবহন খরচ হয় বস্তা প্রতি ২০-২৫ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আমি কৃষক পর্যায়ে ১০০-১১০ টাকা বস্তা বিক্রয় করি। এ ব্যবসায় মোটামুটি ভালো লাভ হয়, গতবছরও আমার সব খরচ বাদ দিয়ে ৫-৬ লক্ষ টাকা লাভ ছিল। তবে বর্তমানে আমার দেখাদেখি অনেকেই এই ব্যবসা শুরু করেছে।
দাশুরিয়ায় অবস্থিত ফকির অটো রাইস মিলের একজন কর্ণধার বলেন, কয়েক বছর পূর্বেও রাইস মিলের ছাই এর কোন দাম ছিল না। তবে এখন কৃষি জমিতে এই ছাই ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা মিলে এসে ছাই কিনে নিয়ে যায়, প্রতিবস্তা ছাই আমরা ২০-২৫ টাকায় বিক্রয় করি। এতেও প্রচুর লাভ হচ্ছে।
সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজিব আল মারুফ বলেন, বীজতলায় ব্যবহৃত ছাই ও গোবর প্রাকৃতিক বালাইনাশক হিসেবে কাজ করে।পেঁয়াজের চারাকে ক্ষতিকর পোকা থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও এগুলো (জৈব সার) অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে কমতে থাকা জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে।
ফরিদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল- ইমরান বলেন, পেঁয়াজের বীজতলায় ছাই ব্যবহারে চারার শেকড় শক্তিশালী হয়। এতে চারা তুলে পুনরায় রোপনের সময় আঘাত জনিত ক্ষতি হয় না। বীজতলাকে ছত্রাক ও বিষাক্ত পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে। পেঁয়াজের বীজতলায় জৈবসার ব্যবহার নিয়ে কৃষকদের সচেতন করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। পেঁয়াজের বীজতলায় ছাই ব্যবহার কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে বলে মনে করি।
কৃষি সম্প্রাসারন অধিদপ্তর পাবনার উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, এবছর পাবনায় পেঁয়াজ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা ৫৬ হাজার ৫৭৫ হেক্টর ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৯ লক্ষ ৫০০ মেট্রিক টন। পেঁয়াজ রোপন করার লক্ষ্যে বীজতলা তৈরীর প্রস্তুতি নিচ্ছে কৃষক। পেঁয়াজের বীজতলায় ছাই ও গোবর ব্যবহার কৃষির জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বীজতলায় ছাই ও গোবর ব্যবহারে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমবে,এতে সার সংকট হ্রাস পাবে। ছাই ব্যবহারে বীজতলা ছত্রাক ও পোকামাকড় থেকে রক্ষা পায়। এবিষয়ে কৃষকদের আগ্রহী করতে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কর্মসুচি গ্রহন করা হবে।





