জেলা প্রতিনিধি, পাবনা: পেঁয়াজের বাজারে টানা লোকসান আর অনিশ্চয়তায় পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুরের কৃষক বাকু খাঁ-র। তবে আর্থিকভাবে পুরোপুরি লোকসান পুষিয়ে উঠতে না পারলেও অবশেষে হতাশার মেঘ কাটিয়েছে সোনালি আঁশ পাট। গত বছর পাটের কম ফলন ও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় এবার জমি কিছুটা কমিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। তবে এই ভুল অনুশোচনার নয়, বরং এক মিষ্টি আনন্দের। কম জমিতে পাট আবাদ করেও এবার তিনি দেখছেন খরচের তিনগুণ বেশি মুনাফার মুখ।
পাবনা জেলায় চলতি মৌসুমে ৪২ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা থেকে প্রায় ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯৮৭ বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। জেলার সুজানগর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও সাঁথিয়া উপজেলার মতো সদর উপজেলার চর এলাকাগুলোতেও এবার পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। দায় পড়ে বা জমি বসিয়ে না রাখতেই কেবল পাট আবাদ করা বাকু খাঁ-র মতো অনেক চাষির কাছেই এবার পাট হয়ে উঠেছে লাভের ফসল।
কৃষক বাকু খাঁ জানান, পেঁয়াজে ধারাবাহিক লোকসানের পর পাট বুনেছে লাভের গল্প। চর এলাকার নিচু জমিতে সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও বর্ষার পানি পাওয়ায় পাট পচানো ও ধোয়ায় কোনো ঝক্কি পোহাতে হয়নি তাকে। অনুকূল আবহাওয়ায় পাটের আঁশও হয়েছে চমৎকার ও উজ্জ্বল।
খরচ ও ফলনের হিসাব দিয়ে এই কৃষক জানান, চর এলাকার জমিতে ঘাস কম হওয়ায় এবং নিজের জমিতে চাষ করার কারণে লিজের খরচ থেকে বেঁচে গেছেন তিনি।
বিঘাপ্রতি তার সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিপরীতে ফলন মিলেছে বিঘা প্রতি গড়ে ১০ মণ করে। বর্তমানে বাজারে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩৮০০ থেকে ৪২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে গড়ে সবাই ৪ হাজার থেকে ৪২০০ টাকা পর্যন্ত দাম পাচ্ছেন। অথচ গত বছর এই বাজারে পাটের দর ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকার বেশি ওঠেনি। এবার খরচ বাদ দিয়ে বিঘা প্রতি খরচের প্রায় তিনগুণ লাভ পকেটে পুরছেন তিনি।
কৃষি বিভাগের মতে, রপ্তানির সুযোগ বাড়ায় এবং বাজারে পাটের চাহিদা তৈরি হওয়ায় এবার কৃষকরা পাটের ভালো দাম পাচ্ছেন। চরাঞ্চলের মতো নিচু এলাকার পাশাপাশি পুরো জেলাতেই সোনালি আঁশের ভালো আবাদ কৃষকদের নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। লোকসানের বৃত্ত ভেঙে বাকু খাঁ-র মতো পাবনার হাজারো কৃষকের মুখে এখন তাই ফুটছে সোনালি আঁশের সোনালি হাসি।
চাটমোহর চলনবিলের পাট চাষী আরশেদ আলী বলেন, ঠিক সময়ে পানি পাওয়ায় এবার ধোয়া ও পরিবহণে ভোগান্তি কম ছিলো। কালার ও মানে পাট ভালোও হইছে। মণ প্রতি প্রায় ৩ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।
এদিকে অন্যান্য উপজেলার তুলনায় সুজানগরে খরচ ও পাট আবাদে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। এখানে লিজমানি ও লেবার ব্যয় বেশি হওয়ায় সবমিলিয়ে বিঘাপ্রতি খরচ পড়ে যায় ২২-২৮ হাজার টাকা। তবে এখানে ফলনও ভালো হয়ে থাকে। উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, এবার সুজানগরে গড় ফলন হয়েছে ১১-১২ মণ করে। কারো কারো ১৪ মণও হয়েছে। তবে দাম নিয়ে ব্যাপক সন্তুষ্ট তারা।
পাট ব্যবসায়ী মো. আবদুল হাসান বলেন, এই এলাকার পাটের মান বরাবরই খুব ভালো, আবহাওয়া ভালো থাকায় পাটের আঁশও বেশ উজ্জ্বল। এ বছর হাটে পাটের সরবরাহ ও চাহিদা ভালো। কৃষকরা লাভবান হচ্ছে।
পাবনার মাটি ও আবহাওয়া পাট চাষে খুবই উপযোগী হওয়ায় জেলায় পাটের আবাদ ও ফলন বেড়েছে জানিয়ে পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. লুৎফর রহমান বলেন, পাট রপ্তানির সিদ্ধান্তে এবার কৃষকরা ভালো বাজার পাচ্ছে। রপ্তানির পাশাপাশি দেশে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ালে চাহিদা ও বাজার আরো ভালো হবে। এতে কৃষকরা পাট চাষে আরো আগ্রহী হবেন।






