কৃষি খবর ডেস্ক: শেরপুর ও জামালপুরের গারো পাহাড় এলাকায় প্রায় ১৫০টি বন্যহাতি বিচরণ করছে। ভারতের মেঘালয় থেকে আসা হাতিগুলো দুই বছর ধরে নিজ আবাসস্থলে ফিরতে পারছে না বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় থাকা গেটগুলো বন্ধ থাকায় হাতির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে হাতির খাদ্য সংকটের পাশাপাশি ফসল ও বসতবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষ-হাতির সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, হাতিগুলো কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় বিচরণ করছে। দলগুলোতে ২৫ থেকে ৩০টি শাবকও রয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে এসব হাতি প্রায় লোকালয় ও কৃষি জমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বসতবাড়ি, বাড়ছে মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০০০ সালের দিকে মেঘালয় থেকে ১০ থেকে ১৫টি বন্যহাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরে বংশবিস্তারের ফলে হাতির সংখ্যা বেড়েছে। একসময় হাতির দল নিয়মিত বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মধ্যে চলাচল করত। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মেঘালয় রাজ্যের সঙ্গে শেরপুর ও জামালপুরের সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। হাতির চলাচল সহজ করতে সেখানে ৪৪টি গেট ও নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে গেটগুলো বন্ধ থাকায় হাতির পাল স্বাভাবিক পথে ভারতে ফিরতে পারছে না।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনও প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি বলে তাদের দাবি।

হাতির আবাসস্থলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে তারা খাদ্যের সন্ধানে কৃষিজমি ও লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। হাতির তাণ্ডবে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছেন স্থানীয় কৃষকরা। অন্যদিকে হাতির উপস্থিতিতে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা।

নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা এলাকার কৃষক যোসেফ মারাক বলেন, এমন কোনো বছর নেই, যে বছর হাতি এসে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি করে না। খাবারের খোঁজে হাতির পাল ছোটাছুটি করায় অতিষ্ঠ তারা। বছরের পর বছর ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় ঠিকমতো ঘরে ধান তুলতে পারেন না। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল হাতি নষ্ট করে দেওয়ায় পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

বন বিভাগের তথ্যমতে, হাতির পালের আক্রমণে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে প্রায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এ সময়ে হাতির সঙ্গে সংঘাতে ১০ জন মানুষ ও চারটি বন্যহাতি মারা গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজের মতে, হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ-হাতির সংঘাত বাড়তে পারে। এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও ভারতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।