কৃষি খবর ডেস্ক: ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় চড়ে বিলপাড়ের শত শত দরিদ্র মানুষ সংগ্রহ করছে শামুক। গোপালগঞ্জের বিভিন্ন বিল ও জলাশয়ে প্রধানত বর্ষা মৌসুমে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। সদর উপজেলার সাতপাড়, বলাকোড়, বড়খোলা, কাশিয়ানীর সিংগা, বরইভিটা, রাহুথড়, বরমপাল্টা, পাথরগ্রাম; মুকসুদপুরের চান্দার বিল এবং টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণিবিল, বাঘিয়ারকুল, জোয়ারিয়ার বিলসহ জেলার বিভিন্ন জলাভূমি থেকে প্রতিদিন অবাধে সংগ্রহ করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ শামুক। 

এসব শামুক পরে জমা হচ্ছে স্থানীয় সিংগা গ্রামের মল বাজার, বরমপাল্টা এবং কোটালীপাড়ার রামনগর বাজারে। প্রতিদিন এভাবে চলছে শামুক সংগ্রহ ও বেচাকেনা। এছাড়া গ্রাম ঘুরে সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ বিক্রেতার কাছ থেকে বস্তাভর্তি শামুক কিনছেন ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। সেখান থেকে তা যাচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মাছের ঘেরে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামুক সংগ্রহ ও বেচাকেনার মাধ্যমে চলে এর সঙ্গে জড়িতদের পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনাসহ সংসারের খরচ, কিন্তু এই বাণিজ্যের আড়ালে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বিলের চেহারা। একসময় যে পানিতে চোখে পড়তো অসংখ্য শামুক, এখন সেখানে আগের মতো চোখে পড়ে না।

সিংগা গ্রামের শামুক সংগ্রহকারী সমীর বিশ্বাসের দিন শুরু হয় খুব ভোরে। বর্ষা মৌসুমে বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করেই চলে তার সংসার। তিনি বলেন, ‘বিল বা জলাশয় থেকে শামুক তুলি। সেই শামুক বিক্রি করে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাই ‘ 

সিংগা উত্তরপাড়ার মল্লিক বাড়ির অনাধি মৌলিকের জীবনেও বর্ষার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শামুক সংগ্রহ। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শুরু হয় তার কাজ। সকাল ৯টা পর্যন্ত বিলের পানিতে শামুক ও শাপলা সংগ্রহ করেন তিনি। 

অনাধির ভাষ্য, এই কাজ করেই বর্ষা মৌসুমের আয়-রোজগার হয়। দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পিরোজপুর থেকে পাইকাররা এসে শামুক কিনে নিয়ে যান। গতবছর বিলে শামুক খুবই কম ছিল, আয়ও কম হয়েছে। এবার তুলনামূলক একটু বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী অরুণ গোলদার বলেন, ‘বিল এলাকার মানুষদের কাছ থেকে শামুক কিনে বাগেরহাটের চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। খরচ বাদে বস্তাপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা লাভ হয়। যা হয় তা দিয়ে ভালোই আছি।’

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘নির্মল পানি পেতে শামুকের ভূমিকা রয়েছে। বিল বা জলাশয়ের আবর্জনা ও বিভিন্ন দূষিত বস্তু খেয়ে শামুক জীবনধারণ করে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। জলাভূমি রক্ষায় শামুকের গুরুত্ব অনেক।

ড. রাশেদুজ্জামানের মতে, জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রে ছোট প্রাণী বলে কোনো প্রাণীই অগুরুত্বপূর্ণ নয়। শামুকও তার বাইরে নয়। জলজ পরিবেশের জৈবিক প্রক্রিয়ায় শামুকের ভূমিকা রয়েছে বেশ। জলাশয়ের বিভিন্ন জৈব পদার্থ ও আবর্জনা খাওয়ার মাধ্যমে শামুক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জলজ প্রাণী ও মৎস্য সংরক্ষণে সর্বদা সচেষ্ট। গোপালগঞ্জের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কাজ করছি। লোকবল সংকট থাকা সত্ত্বেও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জলজ প্রাণী ও মৎস্য রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছেন। 

‘শামুক সংগ্রহকারী ও বিক্রেতাদের সঙ্গে সভা করে অতিরিক্ত শামুক আহরণ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশা করি উদ্যোগটি ফলপ্রসু হবে’- বলেন এই মৎস্য কর্মকর্তা।