কৃষি খবর ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সারাদেশে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। এতে ঋণের বোঝা থেকে স্বস্তি পেয়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা আর খেলাপি হওয়ার কারণে নতুন করে ব্যাংকঋণ না পাওয়ার সংকটে থাকা এসব কৃষকদের ঋণের সুদসহ মোট ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সরকার।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজার মন্দায় জর্জরিত প্রান্তিক চাষিরা ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন উদ্যমে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করছেন। সরকারের এই পদক্ষেপে চড়া সুদের মহাজনি দাদন ব্যবসার শৃঙ্খল ভেঙে কৃষকরা পুনরায় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ধারায় ফিরে আসছেন, যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহণকারী এসব কৃষকের মূল ঋণের ওপর যত টাকাই সুদ বা বকেয়া জমা হয়েছে, এর সম্পূর্ণ আসল ও সুদ মওকুফ করেছে সরকার। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কৃষকবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত এ কর্মসূচিকে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় উপহার। এ উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

তিনি বলেন, কৃষক বাঁচলে উৎপাদন বাড়বে, আর উৎপাদন বাড়লে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। তাই কৃষকদের টেকসই স্বাবলম্বী করতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা ও ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শুধু ঋণ মওকুফের মাধ্যমে কৃষকদের সব সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, কোনো কোনো কৃষকের ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার, ৩০ হাজার বা ৫০ হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি হতে পারে। তবে ঋণ মওকুফের এই উদ্যোগ কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি বয়ে আনবে।
যশোর সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষকের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এ স্বস্তির বাস্তব চিত্র। তারা বাসসকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায় থাকার পর সরকারের ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।

উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের নারাঙ্গলী গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি। ঋণ পরিশোধের জন্য বাড়ির গাছ কিংবা গোয়ালের গরু বিক্রির কথাও ভাবছিলেন। কিন্তু ঋণ মওকুফ হওয়ায় তাঁকে আর এসব সম্পদ বিক্রি করতে হয়নি।

ফারুক বলেন, ‘আমার মতো মানুষের ওপর থেকে বড় একটা বোঝা নেমে গেছে। বিপদের সম্বল বাড়ির গাছ, গরু কিছুই বিক্রি করতে হয়নি।’

দেশব্যাপী এ কর্মসূচির সিংহভাগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংকটি মোট ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন প্রান্তিক কৃষকের ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।

বাকি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৮০৩ জন কৃষক রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এই সুবিধা পেয়েছেন। তাদের অনুকূলে বাকি প্রায় ৭৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা মওকুফ নিশ্চিত করেছে সরকার।

২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী খাতে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। নির্ধারিত ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ বিতরণ ছিল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। আগের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বিতরণ করা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।