কৃষি খবর ডেস্ক: কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে সরকার। দেশে থাকা এই গ্রুপের বালাইনাশকের মজুত আগামী ছয় মাসের মধ্যে শূন্য করতে হবে। একই সঙ্গে এ গ্রুপের বালাইনাশক আমদানি, নতুন নিবন্ধন এবং বিদ্যমান পণ্যের লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠিত বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিটাক) ৯১তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে প্যারাকোয়াট গ্রুপের বালাইনাশকের মজুত ৩৯৫ টন। চিঠি জারির পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে এই মজুত শূন্য করার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে গ্লাইফোসেটের ক্ষেত্রে কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, গ্লাইফোসেট গ্রুপের বালাইনাশকের অবস্থা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত পিটাকের ৮৮তম সভায় নেওয়া আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও পিটাকের সভাপতি ড. মো. আবদুছ ছালাম। তিনি সমকালকে বলেন, জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ বিপজ্জনক বালাইনাশক ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেটের বিষয়ে এবার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশে থাকা প্যারাকোয়াট গ্রুপের বালাইনাশকের মজুত আগামী ছয় মাসের মধ্যে শূন্য করতে হবে। এ ছাড়া ৮৮তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্লাইফোসেটের মজুতও শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে এ দুটি গ্রুপের বালাইনাশক আমদানি, নতুন নিবন্ধন এবং বিদ্যমান পণ্যের লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আহসানুল হক বলেন, প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট– দুটিই আগাছা দমনে ব্যবহৃত রাসায়নিক। তবে জনস্বাস্থ্য নিয়ে প্যারাকোয়াটের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ অনেক বেশি। এবারের পিটাক সভায় বিপজ্জনক বালাইনাশক বাজার থেকে প্রত্যাহারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন, বন্দরে বালাইনাশক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি, গবেষণা করে ভারী ধাতু দূষণের উৎস খুঁজে দেখার মতো বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ব্রাজিলসহ বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ এই আগাছানাশকটি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে বাংলাদেশে এতদিন কৃষিতে এর ব্যবহার বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে প্যারাকোয়াটের বিষক্রিয়া নিয়ে চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায়ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।


বাংলাদেশে অবশ্য এত দিন এটি কৃষিতে ব্যবহার হয়ে আসছিল। ২০২৬ সালের মেতে প্রকাশিত গবেষণায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ২০১৩ সালে দেশে প্যারাকোয়াট আমদানি ছিল ৫৩ টনের কিছু বেশি; ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৪ হাজার ৬৯৫ টনে দাঁড়ায়।

প্যারাকোয়াটের পাশাপাশি গ্লাইফোসেট নিয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে পিটাক এবার নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, গ্লাইফোসেট গ্রুপের বালাইনাশকের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।

গ্লাইফোসেট বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত আগাছানাশক। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা ২০১৫ সালে গ্লাইফোসেটকে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বা ‘গ্রুপ ২এ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। সংস্থাটি মানুষের ক্ষেত্রে সীমিত প্রমাণ, প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় পর্যাপ্ত প্রমাণ এবং জিনগত ক্ষতির বিষয়ে শক্তিশালী প্রমাণের কথা জানিয়েছিল।

 

সভায় মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা পরীক্ষার ফল পর্যালোচনা করে ৪৫টি জৈব বালাইনাশক নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ধানের ব্লাস্ট ও পাতা মোড়ানো পোকা, ভুট্টার কর্ন বোরার ও ফল আর্মিওয়ার্ম, আলুর মড়ক, শসার ডাউনি মিলডিউ, চা গাছের কলার রট ও ব্রাঞ্চ ক্যানকার এবং বিভিন্ন ফলের ফলমাছি দমনের পণ্য রয়েছে। বিশেষ করে করলা, আম ও পেয়ারা বাগানে ফলমাছি দমনে বিভিন্ন ফেরোমোন ও আকর্ষকভিত্তিক জৈব বালাইনাশকের বেশ কয়েকটি পণ্যের নিবন্ধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কার্যবিবরণীর তালিকায় এসব পণ্যের মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতার হারও উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে গত জুলাই মাসে পিটাকের ৯০তম (বিশেষ) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ১৯৬০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৯টি বালাইনাশক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে আরও ১৭টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশকের ব্যবহার থেমে নেই। এসব বালাইনাশক এক হাজার ৭৪১টি ব্র্যান্ড নামে নিবন্ধিত এবং বাজারে বিক্রি হচ্ছে। 

বালাইনাশক পরীক্ষা করার পর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কৃষি মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দরে চিঠি দিয়ে আমদানি করা পণ্য পরীক্ষার ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপের নির্দেশনা দেয়। তবে সে সময় ব্যবসায়ীদের চাপে তখনকার কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বিষয়টি ছয় মাস স্থগিতের সুপারিশ করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়, পিটাক বা কৃষি বিভাগ কেউই আর উদ্যোগ নেয়নি।

তবে প্রায় ছয় বছর পর ৯০তম পিটাক সভায় বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, শুধু প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট নয়, এ ধরনের বিষাক্ত ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্ষতির মাত্রা নিরূপণের জন্য পেশাজীবী ও গবেষকদের একটি কমিটি করা হয়েছে। ওই কমিটি একটি প্রতিবেদন দেবে। এরপর ওই প্রতিবেদনকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরা হবে। খুব ক্ষতিকর প্রমাণ পাওয়া যায়, বাকি বালাইনাশকও নিষিদ্ধ করা হবে।

সূত্র: সমকাল